সোম. নভে ১৮, ২০১৯

আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা জাবি বন্ধ ঘোষণা

১ min read

অনলাইন নিউজ ডেস্ক :: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অপসারণ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এতে আট শিক্ষকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। দায়িত্ব পালনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার সাংবাদিককে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি  সিন্ডিকেট ডেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন।
গতকাল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে আন্দোলনকারীদের উপাচার্যের বাসার সামনে থেকে হটিয়ে দেয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এতে দীর্ঘ দশদিন পর অফিসে প্রবেশ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। তাকে আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে ‘মুক্ত’ করায় ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ জানান উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য বলেন, আমার সহকর্মীসহ ছাত্রলীগের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

কারণ তারা দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করেছে। এখন সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য সবাই আমাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন।
ছাত্রলীগের হামলায় আহত শিক্ষকরা হলেন- নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাইদ ফেরদৌস, মীর্জা তাসলিমা সুলতানা, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার হাসান মাহমুদ, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানাসহ আরো দুই শিক্ষক। মারধরে আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে- ৪৪তম আবর্তনের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের মরিয়ম ছন্দা, দর্শন বিভাগের মারুফ মোজাম্মেল, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের মাহাথির মুহাম্মদ, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাইমুম ইসলাম, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের রাকিবুল ইসলাম রনি, ৪৫তম আবর্তনের দর্শন বিভাগের রুদ্রনীল আহমেদ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সৌমিক বাগচী, ৪৭তম আবর্তনের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাউদা, ৪৮তম আবর্তনের ইংরেজি বিভাগের আলিফ মাহমুদ, অর্থনীতি বিভাগের উল্লাস।
এছাড়া সংবাদ সংগ্রহের সময় ছাত্রলীগের হামলায় আহত সাংবাদিকরা হলেন- প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাইদুল ইসলাম, বার্তা২৪.কমের প্রতিনিধি আজাদ, বার্তাবাজারের প্রতিনিধি ইমরান হোসাইন হিমু, বাংলালাইভ২৪.কমের প্রতিনিধি আরিফুজ্জামান উজ্জল।
জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে প্রায় দুই মাস ধরে আন্দোলন করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দুর্নীতির দায়ে তাকে পদত্যাগের আলটিমেটামের পরও তিনি পদত্যাগ না করলে আন্দোলন জোরদার হয়। এর মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে বিষয়টি তদন্তের আহ্বান জানালে আন্দোলনকারীরা তা নাকচ করে আন্দোলন চালিয়ে যায়। সোমবার সন্ধ্যায় আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে তার বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। এরপর গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১২টার দিকে উপাচার্যপন্থি শিক্ষকরা উপাচার্যকে বাসা থেকে বের করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। এরপরই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবির মুক্ত করতে মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় উপাচার্যপন্থি শিক্ষক সোহেল আহমেদ, নাসির উদ্দিন, আতিকুর রহমান, আব্দুল মান্নান চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমান জনিসহ কয়েকজনকে ‘ধর ধর’, ‘জবাই কর’ ও ‘মার মার’ বলে চিৎকার করতে দেখা গেছে। হামলায় আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ২০ জনকে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। এ ঘটনার পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জরুরি সিন্ডিকেট ডেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে এবং সাড়ে ৫টার মধ্যে সকল আবাসিক হল বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে নির্দেশ দেয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে আন্দোলনকারীরা। শিক্ষকসহ প্রায় ৩০০ জন মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার উপাচার্যের বাসা অবরোধ করতে গেলে সেখানে অবস্থানরত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দেয়। তাদের বাধায় আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাসভবন সংলগ্ন সড়কে বসে অবস্থান নেয়। এ সময় তারা উপাচার্যের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান থেকে সরবে না বলে জানান। একই স্থানে আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। পরে আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা পরিবহন চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। এছাড়া ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে আবারো হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ছাত্রলীগের মারধরের বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষক পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খবির উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এরকম ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। উপাচার্যপন্থি শিক্ষকদের উপস্থিতি ও প্রত্যক্ষ উস্কানিতে ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। ছাত্রলীগ যখন আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে তখন ভিসিপন্থি শিক্ষকরা তাদেরকে স্বাগত জানিয়ে উৎসাহ ও হাততালি দিয়েছে।’
হামলার বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘আমরা শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস চাই। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল।’ তবে আন্দোলনে শিবির সম্পৃক্ততার ছাত্রলীগের অভিযোগ অস্বীকার করে আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘আন্দোলনে কোনো শিবির সংশ্লিষ্টতা নেই। যেকোনো শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য শিবির ব্লেইম দেয়াটা পুরনো অপকৌশল। বুয়েটের আবরারকে এভাবেই হত্যা করা হয়েছে, এখানেও একইভাবে অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয়েছে। উপাচার্য অপসারণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এমন অনেকেই আজ ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছে যারা ক্যাম্পাসে বামপন্থি রাজনীতির চিহ্নিত মুখ। তাই ক্যাম্পাসে শিবিরের ধুয়া তোলা তাদের দুর্নীতি ঢাকারই অপকৌশল।’
হামলার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) আ.স.ম. ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে উত্তেজনা চলছিল। চেষ্টা করেও আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। বড় ঘটনা এড়াতে আমরা তৎপর রয়েছে।’

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.