বুধ. সেপ্টে ২৩, ২০২০

কড়াইল বস্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই

১ min read

বৃহস্পতিবার রাতে মুড়ি খেয়ে রাত পার করেছি। এক বাসা থেকে এনে সকালের খাবার খেতে প্রায় দুপুর হলো। থাকার ব্যবস্থা করার পর এখন গার্মেন্টসে কাজে যাবো। কাজ না থাকলে খাবো কী। বাসা মালিক ও ভাড়াটিয়ারা মিলে আবার ঘর তোলার পরিকল্পনা নিয়েছি। নিজের মতো করে প্রাথমিক কাজও শুরু করেছি।’ কথাগুলো বলেছেন সমপ্রতি কড়াইল বস্তিতে আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি পরিবারের উপার্জনকারী গার্মেন্টস কর্মী মালা খাতুন। সরজমিন তিনি এই প্রতিবেদককে আরো বলেন, আমরা একটু সহানুভূতি চাই। থাকার ঘর, পরনের কাপড় ও ভাত চাই। এটুকু দিয়ে যেন আমাদের বাঁচিয়ে রাখা হয়। এত দিনের বসতি ও পরিচিতদের ছেড়ে যাবো কোথায়। এখানে ভাড়া কম। এখানেই সংসার সাজাবো। শুধু মালা খাতুনই নন, কড়াইল বস্তিতে এখন বহু পরিবারের এমনই আর্তনাদ। এর চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। বাতাসে পোড়াগন্ধ। মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া কড়াইল বস্তির বসতি। গত বুধবার দিবাগত রাতে ভয়াল আগুনে নিঃস্ব হয়ে গেছে সহস্রাধিক বস্তিবাসী। বস্তির বড় অংশ এখন কয়লা ও আবর্জনার স্তূপ। এর এক দু’দিন যেতে না যেতেই জীবন মেতে উঠেছে সৃষ্টির নতুন উৎসবে। নিঃস্ব বস্তিবাসী শূন্য থেকে আবার শুরু করেছেন ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি। রিক্ত হস্তে গত শুক্রবার থেকে তাদের বসতভিটার আবর্জনা সরাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। গত দুদিন ধরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে আরো অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দেয়া খাবার এবং অনাহার-অর্ধাহারে পার করেছেন কয়েক বেলা। তারপর থেকে সেই ধ্বংসস্তূপেই কাপড়, ত্রিপল ও টিনের আড়াল তৈরি করে থাকার প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, চারদিকে পোড়া ইট, টিন, কাঠ, আসবাবপত্র, তোষক, চাল, ডাল, গম, কৌটা, প্লাস্টিক কতকিছুর ধ্বংসাবশেষ। মাঝে মাঝে ইটের বিবর্ণ দেয়ালের কিছু অংশ দাঁড়িয়ে আছে। এলোমেলো টিনের স্তূপ দখল করে আছে বড় অংশ। পুড়ে যাওয়া ছোটখাট জিনিসপত্র ও খাবার মাটির সঙ্গে একাকার। বাসার সব জিনিসপত্র পুড়ে মেঝেতে পড়ে আছে কয়লা। এ অবস্থায় কড়াইল বস্তির পোড়া অংশ জুড়ে কেবলই টুং টাং শব্দ। খালি আকাশের নিচে প্রায় বসতভিটায় চোখে পড়েছে বাসিন্দাদের কর্মচঞ্চল উপস্থিতি। অধিকাংশই পরিষ্কার করছিলেন ময়লা-আবর্জনা। কাঁচের টুকরো, লোহার খণ্ড ও ধারালো পিন মেশানো ময়লার স্তূপ হাতড়ে ফিরছিল নিঃস্ব মানুষের উৎসুক আঙুল। মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছিল কিছু স্বর্ণ বা ইমিটেশনের গয়না, পোড়া ধাতব মুদ্রা ও আধপোড়া ছোটখাট জিনিসপত্র। তবে এজন্য মূল্যও দিতে হচ্ছিল। আঙুল ও হাতের বিভিন্ন অংশ কেটে কাদার স্তূপ রক্তাক্ত হচ্ছিল। একইভাবে রক্তাক্ত হতে দেখা গেছে বস্তির বউবাজার অংশের ৪৫৬ নম্বর বাসার ভাড়াটিয়া কবিরকে। এর আগে তার পরিষ্কার করা এক চাটাই মেঝেতে বসে উদাস চিত্তে বসেছিলেন তার স্ত্রী শাহনাজ। নিজের একমাত্র শিশুকন্যা ববিতাকে (৭) নিয়ে স্বামীর বরগুনার বুড়িচংয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পর ঘটে এ দুর্ঘটনা। তখন বাসায় ছিলেন কেবল পোশাক শ্রমিক শাহনাজ। আগুনের পর দিন ধার করে আনা একটি বেডসিটের কাপড় টানিয়ে রোদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন তিনি।
শাহনাজ বলেন, আগুনে সব গেছে। কিছুই নেই। আমরা ১১ বছর ধরে এই ঘরে ভাড়ায় থাকি। এখন স্থানটুকু পরিষ্কার করে আপাতত থাকার ব্যবস্থা করছি। বাসা নির্মাণ মালিক বা যেই করুক এখন তো আমাদেরকে থাকার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। এখন পকেটে একটা টাকাও নেই। তবে কয়েক বেলার প্যাকেট খাবার একাধিক সংস্থার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে।  কিছুটা দূরে বসে আছেন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মোখলেছুর রহমান। তার বসতি ও ব্যবসা দু’ই ছিল কড়াইল বস্তিতে। এক রাতে সব গেছে। পরনের কাপড় ছাড়া তারও কিছুই রেহাই পায়নি। ধ্বংসস্তূপের ইট কিছুটা সরিয়ে নিয়ে স্টবের চুলায় বসিয়েছে দু’টি চায়ের কেটলি। অগ্নিকাণ্ডের পরদিন সকাল ১১টার দিকেই তিনি শুরু করেন ব্যবসা।
তিনি বলেন, কিছুই তো আর নেই। কেবল প্রাণে বেঁচে আছি। যেহেতু বেঁচে আছি, তাই হাত গুটিয়ে বসে থাকলে কী পেট চলবে। তাই কেটলি জোগাড় করে আবার ব্যবসায় নেমে পড়েছি।
বস্তির বউবাজার এলাকার ৪৬১ নম্বর হোল্ডিংয়ে টিনের দ্বিতল বাসা ছিলো ছিদ্দিক ও তার স্ত্রী মিনারা বেগমের। তাতে ভাড়ায় থাকতো আরো চার পরিবার। হালিমা, আমিনা, শহীদুল ও সাগরের পরিবার। একটা বড় ছাতার নিচে চাটাই বিছিয়ে তাতে বসেছিলেন তারা। উঠতি রোদে সঙ্গে বসেছিলেন অন্য বাসার আরো কয়েক বাস্তুহারা। কারও মুখে কথা নেই। বিমর্ষ সবাই। কেউ খেয়েছেন। কেউবা অনাহার অর্ধাহারে।
এখন কী করবেন জানতে চাইলে মিনারা বলেন, আগুনের পর গত বৃহস্পতিবার রাত ছিলাম নির্ঘুম। কুয়াশায় বসে থেকে রাত পার করেছি। শুক্রবার সকালে এই অংশ পরিষ্কার করে অন্তত বসার স্থানটুকু করেছি। কি আর করবো। আবার বাসা নির্মাণের কাজ শুরু করছি। নিজেরা ও এদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে না?
পাশের ৪৬২ নম্বর বাসায় টিনের পাশে মাথার উপর টিনের ছায়ার ব্যবস্থা করে খেতে বসেছেন মালা খাতুনসহ কয়েকজনের পরিবার। প্রায় সবার শরীর ধুলায় মাখামাখি। পাশে বাসা পরিষ্কারের ধুলায় তারাও ডুবে যাচ্ছিলেন কিছুক্ষণ পরপর। সে অবস্থায়ই এক বাসা থেকে চেয়ে আনা এক কেজি চালের ভাতে ভাগ বসিয়েছেন নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১২ জন। সঙ্গে কিছুটা সবজির ঝোল। তারাও ময়লা সরানো ও ঘর গোছানোর এক ফাঁকে খেতে বসলেন। ধ্বংসস্তূপে সকাল বেলার পেটের দায় মেটাচ্ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.