এপ্রিল ১৫, ২০২১

কুরবানির টাকা নিয়ে টানাটানি : বিশ্লেষণ -মোনায়েম খান

১ min read

আর মাত্র ক’দিন বাকী মুসলিম বিশ্বের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা অত্যাসন্ন। ইহা কুরবানির ঈদ নামে সমধিক পরিচিত। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল লোক বা যাঁদের উপর কুরবানি ওয়াজিব হয়েছ তাঁরা স্ব স্ব অবস্হান থেকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কুরবানি দিয়ে থাকেন । এজন্য ঈদুল আজহা হতদরিদ্র মানুষের কাছে একটি বাড়তি প্রত্যাশা নিয়ে আসে এই ভেবে , মহাখুশির ঈদ উপলক্ষে ধনীদের কুরবানির মাংসের একটি হিস্যা পাওয়া যাবে। অনেক সু্হৃদ ব্যক্তি আছেন যাঁরা কুরবানির মাংসের সাথে গরীব লোকদের মধ্যে কিছু নগদ অর্থও বিতরন করে থাকেন । এই পয়সাগুলো ঈদের আনুসাঙ্গিক খরচের জন্য দীনহীন লোকদের কাছে এক বিরাট যোগান হিসেবে বিবেচ্য হয় ।
কুরবানির সাথে ধর্মীয় ভাবগম্ভীরতা জড়িত। সুষ্টভাবে সম্পন্ন করার মধ্যে অর্পিত ওয়াজিব আদায়ের পরিপূর্ণ সার্থকতা নিহিত। এজন্য কুরবানি যাঁরা দিবেন তাঁরা যেন নিজ তত্বাবধানে ঐ নেক কাজটি করেন , এমন উপদেশ প্রকৃত হাক্কানি ওলামাদের কাছ থেকে শুনেছি , সেই ছোট বেলায় ।
কিন্তু বর্তমানে কুরবানির তাৎপর্য ও গুরুত্ব কিছু নীতিগর্হিত ধর্মব্যবসায়ীদের অসৎ উদ্দেশ্যের থাবায় ম্লান হচ্ছে, অধিকিন্তু লাভজনক ব্যবসা হিসেবে রুপান্তরিত হয়ে গেছে। বিশেষ করে বৃটেন হচ্ছে ঐ সমস্ত ধর্মীয় মুখোশধারী নিকৃষ্ট ব্যবসায়ীদের এক বিস্তৃত উর্বর ভুমি। ওরা ধর্মের নামে অতি সহজে সাধারন মানুষের পকেট হাতড়িযে নিচ্ছে নির্লজ্জভাবে। আর এদেরকে সাহায্য করছে বৃটেনের বাংলা টিভি চ্যানেল গুলো।
ইহা দৃশ্যমান, বৃটেনে অবস্হানরত কিছু মোল্লা মৌলভী চ্যারিটির নামে লাভজনক ব্যবসার পরশা বসিয়ে রেখেছেন। ধর্মপ্রান সাধারন মানুষকে সহজে নেকি হাসিলের চৌকোষ প্রলোভন দেখিয়ে লুন্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে যাকাত , ফিতরা আর কুরবানির পয়সা । হাস্যকরও বটে, প্রায় প্রত্যেক চ্যারিটি দোকানদাররা সাধারন মানুষকে আশ্বস্ত করতে ফিতরা, যাকাত, কুরবানির জন্য আকর্ষনীয় চাঁড় , কমিশন বা প্যাকেজ ডিলের সুযোগ গ্রহণ করার জন্য আহব্বান করে থাকেন। সে আবেদনে কাজও হয় দ্রুত, সরল মনের ধর্মপ্রান অনেক লোক অন্ধবিশ্বাসী হয়ে ঐ সব প্রতারক ব্যবসায়ীদের সৃষ্ট ফাঁদে পা দিয়ে বসেন। মোদ্দাকথা, যাকাত, ফিতরা আর কুরবানির পয়সা নিয়ে বৃটেনের বাংলাদেশী চ্যারিটি নামের দোকান গুলোর মধ্যে অঘোষিত লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ভাবখানি এমন, কে কার আগে ধর্মের দোহাই দিয়ে সাধারন মানুষকে লুন্ঠন করবে । এমন হীনমন্যতা প্রকৃত ধর্মপ্রান মানুষকে অপরিহার্যভাবে সংশয় শংকিত করে তুলেছে ।
একটি বিচক্ষন সুসংগঠিত প্রতারকদল সস্তা সহানুভূতি সহজে অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন দরিদ্র পীড়িত বা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের দু:খ দুর্দশার অতিরঞ্জিত ভিডিও ক্লিপ প্রচার করছে অহরহ। এইসমস্ত ভয়াতুর ভিডিও ক্লিপ দেখে কোমল মনের এক উল্লখযোগ্য পরিমান মানুষ বিগলিত হয়ে পরেন। এবং কালক্রমে নির্দ্ধিধায় কোন যাচাই বাচাই ছাড়াই ঐ সমস্ত ধর্মব্যবসায়ীদের খপ্পরে পরে যান। অতিমাত্র নির্ভরশীল হয়ে পরেন ওদের উপরে ।
বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের সবছেয়ে সংকটাপন্ন দেশগুলো হচ্ছে লিবিয়া , সিরিয়া,ইরাক, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও আফগানিস্তান । দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে ধ্বংসপ্রায় লড়াকু জাতিগুলোর অবর্ননীয় ভুগান্তির কথা শুনে সাধারন মানুষের মনে করুনার উদ্রেক হয় , নি:স্বার্থ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন অনেকে । আর এই সুযোগটাই কাজে লাগান উল্লেখিত ধর্মব্যবসায়ীরা।
ইহা প্রমান সাপেক্ষ সত্য , দুনিযাশুদ্ধ বেশ কিছু মুসলিম দেশ যুদ্ধবিগ্রহের জন্য চরম ভুগান্তির শিকার হচ্ছে। জীবন যাত্রার মান একদম শুন্যের কোটায় নেমে গেছে । উগ্রপন্থী উগ্রচণ্ডী যুদ্ধবাজ লোকদের উদ্দেশ্যহীন বিক্ষিপ্ত সংঘাত ঐ দেশগুলোর অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে অাপামর দেশের জনগন এক অনাবশ্যক অচিন্তনীয দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ঘাম আর তাজা রক্তে সিক্ত হয়ে উঠছে তাঁদের দিকবিস্তৃত ভুখন্ড। একজন মুসলমান হিসেবে অবশ্যই তাঁদের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে । যেহেতু , নিস্পেষন নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাগ্রত বিবেক ফূঁসে উঠবে , ইহা স্বাভাবিক । কিন্তু ইহা কি সত্য নয় , উল্লেখিত দেশগুলোর এমন দু:সহ পরিনতির জন্য খোদ দেশবাসীই বৃহত্তর অর্থে দায়ী । নিশ্চিত, তাঁরা নিজেরা নিজেদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না। অধিকিন্তু পশ্চিমাদের কাঁধে দোষ ছাপিয়ে নিজেদের দায়বদ্ধতা অস্বীকার করছে। যা রুঢ় বাস্তবতার স্বচ্ছ পরিপন্তি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য , যে সমস্ত জাতি স্বীয় ভালমন্দ বুঝার ক্ষমতা রাখেনা তাঁদেরকে ভিন রাষ্ট্র থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে বিশেষ কোন পরিবর্তন অানা যাবে এমন চিন্তা করা অবান্তর , এ বিচারের ভার পাঠকের উপর রেখে দিলাম ।
যাকাত , ফিতরা আর কুরবানির পয়সা নিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর চ্যারিটির কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে যে অশোভন টানাটানি শুরু হয়েছে তা’তে পীষ্ঠ হয়ে প্রকৃত হকদার ব্যক্তিবর্গ যেমন প্রতারিত হচ্ছে ঠিক তেমনি কতিপয় সুযোগসন্ধানী নিকৃষ্ট ধর্ম ধ্বজ্জাধারী অসৎ লোক অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে। দ্বীনি খেদমতের আড়ালে নিরব লুঠপাঠ চালিয়ে যাচ্ছে। এমন সাক্ষাত উদাহরণ ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশও পেয়েছে। এতদ্বসত্ত্বেও, কিছু লোক কেন যে ঐ সমস্ত শকুনী স্বভাবের লোকের প্রতি আস্তাশীল বোধগম্য নয় ।
বৃটিশ-বাংলাদেশী, অনেকের জন্ম বাংলাদেশে। নাড়ীর টান রয়েছে দেশের সাথে । ইহা স্বাভাবিক , দেশে আমাদের স্বজন সহ লক্ষ লক্ষ লোক সীমাহীন অভাব অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন । প্রকৃত অর্থে তাঁরাই যাকাত, ফিতরা অার কুরবানির অংশ পাওয়ার হকদার। আমরা যদি একটু খেয়ালী হই তবে সুষ্ঠভাবে নিজেদের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে হক আদায় করতে পারি ,এজন্য পেশাদার চ্যারিটি ব্যবসায়ীদের দারস্হ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বৃটেনে এমন অনেককে বলতে শুনেছি, ‘বাংলাদেশে আমার কেউ নেই , কা’কে দিয়ে কুরবানি আদায় করবো ‘। কথাটি বিশ্বাসযাগ্য । বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেটের অনেক পরিবারের লোক বাংলাদেশে তেমন আর অবশিষ্ট নেই। তাই বলে কি আত্মীয় স্বজন কেউ নেই? একান্ত যদি তা’ও না থাকে নিশ্চয় নিজের গ্রামের অনেক লোক আছে । ইচ্ছা করলে আপনি তাঁদের মাধ্যমে ওয়াজিব কাজটি করিয়ে নিতে পারেন ।আপনার উপরে তাঁদের দাবী রয়েছে।
মাত্রাধীক আবেগ তাড়িত হয়ে না জেনে না দেখে ভিন দেশে যাকাত , ফিতরা কুরবানির টাকা প্রেরন করা কতটুকু যুক্তিসাপেক্ষ বিবেচনার বিষয় । ভুলের আবর্তে মোহাবিষ্ট হয়ে যাঁরা আত্মীয় পরিজন পরিহার করছেন তাঁরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন। আমার বিশ্বাস তখনই কেবল ঐ মুখোশধারী প্রতারকদের প্রতিহত করা সম্ভব।
লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক, কলামিস্ট

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.