মার্চ ৮, ২০২১

আমাদের দেশ কি শরণার্থীদের পথে হাঁটছে ?

১ min read

কষ্টহলেও পড়ার অনুরোধ করছি……..!!

 

কেবলই কানামাছি কেবলই অন্ধকার ।

পুরো পৃথিবীর চেহারাটাই আজ খ্যাপাটে বলে মনে হতে পারে। পৃথিবীব্যাপী এত অশান্তি, দেশে দেশে এমন রক্তারক্তি কা- আগেও হয়ত হয়েছে, জানেন তা ইতিহাসবিদরা। কিন্তু মানুষ এই একুশ শতকেও কেন মারমুখী স্বভাবের হয়ে উঠছে দেশে-বিদেশে, তার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হয়ত মেলে। যুদ্ধবাজরা তাদের ঘুঁটি যেভাবে চালে, তাতে বিপদ বাড়ে বিশ্বেরই। যুদ্ধবাজরা মধ্যপ্রাচ্যে, এশিয়াতে যে ল-ভ- কা- ঘটিয়েছে, আইএস, আল কায়েদা, তালেবান নামক জঙ্গীদের উত্থান ঘটিয়েছে, তার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজ বাসভূমি ছেড়ে বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিচ্ছে অজানার পথে। শরণার্থী নাম ধারণ করে আশ্রয়ের সন্ধানে ইউরোপের দেশে দেশে পা রাখছে। কিন্তু সেখানেও পদে পদে নানা বাধা। কেউ প্রশ্ন করছে না। কৈফিয়তও চাইছে না, কেন এই লাখ লাখ মানুষকে শরণার্থী হতে হচ্ছে। কী ছিল তাদের অপরাধ। নিজ বাসভূমি ছেড়ে সহায়সম্বলহীন অবস্থায় ভিনদেশে পাড়ি দিতে হচ্ছে, কোন অপরাধে তারা আজ গৃহহীন? কারা দায়ী তাদের এই অবস্থার জন্য। উত্তর আসে না কোনদিক থেকে। যেন এর প্রতিকার নেই। ইউরোপ শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল আপাতত হলেও দীর্ঘস্থায়ী মেয়াদে আরও শরণার্থীর স্রোত নামতে পারবে, তা তো নয়। সিরিয়া, ইরাক, তুরস্ক, লিবিয়া, ইয়েমেন, আফাগানিস্তানসহ অনেক দেশ, যারা সম্পদশালী, সেখানে কেউ স্বস্তিতে নেই। সকলেই সন্ত্রস্ত, এমনকি যুদ্ধবাজরাও। সমস্ত সমাজ হয়ে উঠছে সশস্ত্র। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি। এসব অস্ত্র আসে চোরাইপথে। শক্তিশালী দেশই নিজ নিজ মতলবে দরাজ হাতে অস্ত্র সরবরাহ করছে। উদ্দেশ্য, নানা রকমের গোলমাল বাধিয়ে তেলসম্পদে সমৃদ্ধ দেশগুলোকে নড়বড়ে করে দেয়া। তারা কয়েকটি দেশের সরকারের পতন ঘটিয়ে পরিস্থিতি এমন করেছে যে, গৃহযুদ্ধের রেশ আর থামে না। জঙ্গীবাদের বিপুল বিস্তার ঘটিয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, সরকারপ্রধানদের হটিয়ে নিজেদের পছন্দমতো সরকারকে ক্ষমতায় বসাবে। বসিয়েছেও। কিন্তু কোনকিছুই আর এসব সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তেল সম্পদের দখলকে কেন্দ্র করে লড়াই তুঙ্গে উঠছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে ধর্মীয় পরিচয়। শিয়া-সুন্নি কিংবা কুর্দিদের মধ্যকার লড়াই কেবলই মৃত্যুর মিছিলকে বড় করছে। তদুপরি আইএস নামক বিশ্বত্রাস জঙ্গী সংগঠনটির ধ্বংসাত্মক কর্মকা- এবং সশস্ত্র অবস্থান বিশ্বকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। আত্মকলহের দরুন এই দেশগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। বহিঃশত্রুর শক্তিও বাড়িয়ে তুলছে। এসব দেখেশুনে যে কেউ মন্তব্য করতেই পারেন, আজকের মনুষ্য সমাজকে ঠিক প্রকৃতস্থ বলা চলে না। যখন দেখা যায়, ইউরোপের ভূমিতে পা রাখা বা রাখার আগে নৌকাডুবিতে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে বাংলাদেশীও রয়েছেন। তখন মন বিষণœ হয়ে পড়ে। কারণ ৪৬ বছর আগে নিজ দেশ ছেড়ে শরণার্থী হওয়ার মতো বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে কোটি বাঙালীকে। শরণার্থী জীবনের নির্মমতা কী, তা জানে বাঙালী। কিন্তু স্বাধীন স্বদেশ পেয়ে সেই দুঃসহ জীবনকে ভুলে গিয়েছে বাঙালী। নতুন স্বদেশ তাকে নতুন চেতনা দিলেও সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাকে আবার ফিরে যেতে হয়েছে পূর্বাবস্থায়। পরাধীনতার শেকল হাতে পরাজিত শক্তি পদানত করে রেখেছিল এক যুগেরও বেশি, যার রেশ আজও বহমান।

হয়ত মনে হবে সমগ্র মানব সমাজেরই চিন্তা-ভাবনা দৃষ্টিভঙ্গী বিকারগ্রস্ত এবং সে কারণেই কার্যকলাপও আজ বিকৃত। সভ্য সমাজে যুক্তি ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। মতবিরোধ ঘটলে যুক্তি- বিচারের দ্বারা বিরোধ মেটানো হতো। এখন যুক্তির আর ধারও নেই। ভারও নেই। সব ব্যাপারেই রফা এখন শক্ত হাতে। সামান্যতম বিরোধেও লোহা-ইস্পাত না হলে নিষ্পত্তি হয় না। গায়ের জোর যখন মাথার জোরকে ছাড়িয়ে যায় তখন বুঝে নিতে হয়, মানব সমাজে ঘোর দুর্দিন উপস্থিত। এ শুধু বিশেষ কোন দেশের কথা নয়, সমস্ত পৃথিবীতেই এটা ঘটছে। কবি জীবনানন্দ দাশ জেনেছিলেন,‘ পৃথিবীর এখন গভীর গভীরতর অসুখ’। সেই অসুখ আর সারে না। অর্ধশতাব্দীর বেশি পেরিয়ে গেলেও। বরং অসুখ আরও তীব্রতর হয়ে উঠছে বিশ্বশান্তি শব্দটি ক্রমেই বই আর বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। হিংসা, দ্বেষ, হানাহানি, রক্তারক্তি নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা আজ মানুষের নিজস্ব ভাষায় পরিণত হচ্ছে। হিংসাকে জয় করার কথা বলেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। যিনি নিজেই হরিজনদের হিংসার শিকার হয়ে গুলিতে প্রাণ হারান। এ যে নিতান্তই নীতিকথা আজ। তাই হিংসা আজ পরম ধর্মে পরিণত হয়েছে। এর চর্চা শক্তির অপব্যয় কেবলই।

মানব সমাজ আজ এক নতুন যুগের সম্মুখীন। পুরনো ধ্যান-ধারণা দ্রুত বদলাচ্ছে। ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বোধশূন্য, দ্বিধা-দ্বন্দ্বহীন নিরঙ্কুশ মানুষ, নির্দ্বিধায় যে কোন কাজ করতে প্রস্তুত। এখনই যা নমুনা দেখা যাচ্ছে, মনে হয় পুরো মানুষ নয়, হাফ-ব্যাকড মানুষ, আধ-খেঁচড়া করে ছেড়ে দিয়েছে। জন্তু-জানোয়ারের মতো একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এ জাতীয় মানুষকে যদি বন্যপ্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে সেটাকে কী খুব অন্যায্য ব্যাপার বলে মনে হবে? সত্যি বলতে কী, সভ্যতা আজ বিপন্ন। এ মুহূর্তে দেশে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর সর্বপ্রধান কার্য হওয়া উচিত সভ্যতাকে বর্বরতার হাত থেকে মুক্ত করা। রাজনীতিকে সর্বপ্রকার দুর্নীতির পরিপোষক থেকে সরিয়ে আনা। শহরের রাস্তায় যেমন পুঞ্জীকৃত জঞ্জাল, সমাজের সমস্ত স্তরে তেমন পুঞ্জীভূত দুর্নীতি। এ শুধু আমাদের দেশে নয়, অসাধুতা সারা পৃথিবীতে ছেয়েছে।

পৃথিবীর সকল মানুষ যে একই মানব পরিবারের অন্তর্গত, আমাদের শিক্ষা-সভ্যতা এ বোধটি মানুষের মনে কোনমতেই জাগাতে পারেনি। বরং বিভেদকে আরও বাড়িয়েই দিয়েছে। শিক্ষা যদি পুঁথিগত না হয়ে মানুষকে চেনা-জানার শিক্ষা হতো, মানুষকে ভালবাসার জন্য ধর্মীয় আদর্শকে কাজে লাগাত, রাজনীতি যদি নীতিহীনতা ছেড়ে মানুষের কল্যাণের কথা ভাবত, তাহলে বিভেদ-বিরোধ অনেকাংশ দূর হতো; তা হওয়াটাই সঙ্গত।

লেখক শিহাবুল হক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.