অক্টোবর ২৯, ২০২০

পাউবোর অবহেলার জবাব কে দেবে সরকার না রাষ্ট্র? : মুক্তা

চোখের সামনে হাওরের স্বপ্নের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। মানুষ দিনরাত পরিশ্রম করছেন শেষ রক্ষার আশায়। নিষ্ঠুর প্রকৃতি সব গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা অসময়ে দৌড়ঝাঁপ করছি কিন্তু সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই অবস্থা প্রতি বছর বোরো মৌসুমে ভাটি এলাকায়। বিগত ক’বছর নিবিড়ভাবে এই সব কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার আলোকে কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কথা বলতে চাই। প্রথমেই প্রতিবছর কৃত্রিম দুর্যোগ সৃষ্টির জন্য পাউবো’র অদূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা, সমন্বয়হীনতা, কাজ আদায় করতে না পারার যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাব এবং লুটপাটকে দায়ী করবো।
আমরা অনেকেই পাউবো’র ফসল রক্ষা বাঁধ কোন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয় সে সম্পর্কে অবহিত নই। কারা এই কাজের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ তাও অনেকের কাছে অজানা। আজ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বিভিন্নজনের নানামুখি মন্তব্য ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখে আর মানুষের আহাজারি অবলোকন করে এই মন্তব্য লিখতে বাধ্য হচ্ছি।
প্রতিবছর হাওর রক্ষা বাঁধ শুরুর আগে পাউবো’র মাঠ কর্মকর্তারা তাদের নিজেদের মতো হাওর পরিদর্শন করে প্রাক্কলন প্রস্তুত করেন। কোথায় কাজ হবে, কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হবে তা নির্ধারণ করে জেলা কার্যালয় থেকে প্রধান অফিসে প্রেরণ করা হয়। প্রধান অফিস কাটছাঁট করে বরাদ্দ নির্ধারণ করে কতটি প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে এবং কতটি দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে সেই সিদ্ধান্ত দিয়ে জেলা কার্যালয়কে অনুমতি প্রদান করেন। জেলা কার্যালয় দরপত্র প্রক্রিয়া স¤পন্ন করে কার্যাদেশ প্রদান করেন এবং পিআইসি গঠনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদকে চিঠি দেন। ইউনিয়ন পরিষদ কোন প্রকল্প কোন মেম্বারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবে তা সভা করে নির্ধারণ করেন। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি পিআইসিতে মাননীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক তিন জন সদস্য মনোনীত করা হয় এবং উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক একজন সদস্য মনোনীত করা হয়। মূলত এই সদস্য মনোনয়নকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, লবিং, গ্রুপিং দেখা দেয়। এই সদস্য মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্য ও মনোনীত ব্যক্তিদের সমন্বয় করতে অনেক সময় পার করে পাউবো কর্তৃপক্ষ। এই সুযোগে সুবিধাভোগীরা কলাকৌশলে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। তারা প্রভাব বিস্তার করে কমিটির মূল দায়িত্ব, কর্তব্যের ধারেকাছে না গিয়ে প্রকল্প থেকে কিভাবে আর্থিক সুবিধা নেওয়া যায় তার ধান্ধায় থাকে। যথাসময়ে কমিটিকে কাজ বুঝিয়ে না দিতে পারা এবং সময়মতো কার্যাদেশ প্রদান করতে প্রতিবছরই পাউবো কর্মকর্তারা ব্যর্থ হয়। যখন কার্যাদেশ দিয়ে একাউন্ট খুলে টাকা ছাড় করা হয় তখনই শুরু হয়ে যায় বৃষ্টিপাত। কেউ কেউ আগে ভাগে কাজ শুরু করলেও বেশিরভাগ পিআইসি টাকা না পেয়ে কাজ শুরু করে না। এভাবেই শুরু হয় জটিলতা।
জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা কমিটি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপজেলা কমিটি থাকলেও কাজের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি মূল্যায়নে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কোন কমিটিকে কাজের বিল দেয়া হবে, কারা কতটুকু কাজ করেছে তা যদি অন্তত ইউএনওদের স্বাক্ষরে অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে সেখানে কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো। কিন্তু পাউবো’র কাছ থেকে ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বারদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক কাজের বিল পাউবো উপজেলা বা জেলা কমিটির কোনো অনুমোদন না নিয়েই নিজেরা নিজেদের মতো পরিশোধ করে। নিজেরা প্রকল্প কমিটির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কমিশনের বেড়াজালে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের বন্দি করে। এভাবে যখন কাজ শুরু হয় তখন তাড়াহুড়ো করে টেকসই কাজ না করে বিলের পেছনে দৌড়তে হয় কমিটির সভাপতি ও সম্পাদককে। কাজ করুক আর না করুক পাউবো কর্তৃপক্ষ সহ মধ্যসত্বভোগীদের চাহিদা পূরণে ব্যস্ত থাকতে হয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের।
এতে করে যে অসুস্থ প্রক্রিয়া শুরু হয় সেই প্রক্রিয়ার দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ কৃষককে। হাজার হাজার ফসলহারা মানুষকে। আর দরপত্রের মাধ্যমে কে কাজ পায়, কে বিল পায়। কোথায় কার কাজ। কেউ জানেই না। পাউবো কর্তৃপক্ষ আর ঠিকাদাররা কিভাবে কাজ স¤পন্ন করে, আর কিভাবে টাকা উত্তোলন করে তা জেলা কমিটি বা উপজেলা কমিটিতে আলোচনা হয় বলে আমার জানা নেই। এভাবে অন্ধকারে রেখে কোনো যথাযথ তদারকি আর সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতিবছর দুর্ভোগ নেমে আসে অসহায় কৃষকদের মাঝে। এসব নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা জরুরি। মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা সংশোধন করে বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে মন্ত্রণালয়কে ভাবতে হবে। কোন প্রক্রিয়ায় কাজ টেকসই হবে। কোন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন সুরক্ষিত থাকবে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মানুষ আর কতো প্রতারিত হবে। জীবন আর কতো বিপন্ন হবে।
যখন নলুয়া হাওরপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের এক ভাই জানাল, ক’দিন আগে তার বোনের বিয়ের সময় চল্লিশ হাজার টাকা কর্জ করেছে। ফসল তুলে পরিশোধ করবে। এখন সব তলিয়ে গেছে। তার বাবা অসহায়ের মতো শুধু কাঁদছেন। এখন কি করবে সে? তার প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারিনি। কে দেবে তার জবাব সরকার না রাষ্ট্র?
হাওরপাড়ের ইউনিয়ন পরিষদের একজন দরিদ্র সাবেক জনপ্রতিনিধি জানালেন, ভাই আপনি বলেছিলেন গৃহস্থি করার জন্য। পাঁচ হালের সব তলিয়ে গেছে। কিভাবে বাঁচবো? কোনো উত্তর দেওয়ার ভাষা পাইনি।
সরকার মানুষের কল্যাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। হাওরের উন্নয়নে বড়ো বড়ো বুলি আমরা শুনি। কিন্তু হাওর অঞ্চলের একমাত্র বোরো ফসলকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে কৃষকের গোলায় তুলে দেওয়ার পরিবেশ আমরা করতে পারছিনা এটাতো আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা।
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অসময়ে মাঠে যান, বাঁধে দৌড়াদৌড়ি করেন। কিন্তু প্রক্রিয়াগত ত্রুটির বিরুদ্ধে কথা বলেন না। সমাজ সচেতন বিবেকবান সকলকে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। ভাবনার দিগন্ত উন্মুক্ত হোক। হাওর বাঁচুক, কৃষক টিকে থাকুক। একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে সুষম উন্নয়ন হতে পারে না। কৃষকের জীবন, হাওর অঞ্চলের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে বিষয়টিকে জাতীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। হাওরের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.