অক্টোবর ২৮, ২০২০

রাজধানীর বিভিন্ন ফ্ল্যাট ও বাসা বাড়িতে বিক্রি হচ্ছে মাদক

১ min read

 নতন আলো নিউজ ডেস্ক :রাজধানীর বিভিন্ন ফ্ল্যাট বাসায়ও বিক্রি হচ্ছে মাদক। কোন কোন বাসায় আয়োজন করা হয় বিভিন্ন পার্টির। নাচ-গান কোনো কিছুর কমতি নেই। সেখানে বসেই চলছে ইয়াবা-মাদক সেবন। বিক্রি হচ্ছে বাসা থেকেই। পৌঁছে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ক্রেতাদের বাড়িতে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় বিভিন্ন ফ্ল্যাটে প্রায় রাতেই বসছে মাদকের পার্টি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যানুসারে এরকম সহস্রাধিক ফ্ল্যাট বাসা রয়েছে রাজধানীতে।
এরকম একটি বাড়ি রাজধানীর বংশাল থানার গোলকপাল লেনে। ৪৯/১ নম্বর বাড়ির তিন তলায় নির্বিঘ্নে মাদক কেনা-বেচা হতো। চলতো মাদকের আড্ডা। মাদক বিক্রির জন্য তার ছিল বেশ কয়েক কর্মী। ফোনে যোগাযোগ করে ক্রেতারা মাদক কিনতে যেতো। কেউ কেউ সেখানে বসেই সেবন করতো। প্রায়ই সুন্দরী তরুণীদের উপস্থিতিতে আড্ডা জমতো বাড়িতে। ঘনবসতি এলাকায় দিনের পর দিন এভাবেই চলছিলো আড্ডা, মাদকবাণিজ্য। এটি মাদক ব্যবসায়ী সেলিমের আস্তানা। নিরাপত্তার জন্য ওই বাড়ির গলিতে দাঁড়িয়ে থাকতো তার নিরাপত্তাকর্মীরা। শুধু তাই না, গোলকপালের সরু গলি থেকে বাড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ছিল ১৪টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। তিন তলার একটি কক্ষে ছিল ৩২ ইঞ্চি টেলিভিশন। ওই কক্ষে বসেই সিসি টিভি পর্যবেক্ষণ করতো সেলিম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যকে দেখলেই পালিয়ে যেতো। কিন্তু গত ১২ই ফেব্রুয়ারি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে আর শেষ রক্ষা হয়নি মাদক সম্রাট সেলিমের। ওইদিন অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের সহকারী পরিচালক (উত্তর) মোহাম্মদ খোরশিদ আলম ও সহকারী পরিচালক (দক্ষিণ) মোহাম্মদ সামছুল আলমের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সহকারী পরিচালক সামছুল আলম জানান, ক্রেতার বেশে গেলেও বিষয়টি টের পেয়ে যায় সেলিম। সিসি টিভিতে গতিবিধি লক্ষ্য করে পালানোর চেষ্টা করে। তৃতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে পাশের একটি টিনের চালে পড়ে। তাৎক্ষণিক তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জানান, এর আগেও র‌্যাব অভিযান চালিয়েছিল সেলিমকে গ্রেপ্তার করতে। কিন্তু সিসি টিভিতে র‌্যাবের উপস্থিতি দেখেই পালিয়ে যায় সে। সামছুল আলম বলেন, সেলিমের মতো মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন রাস্তা-ঘাট ছেড়ে ব্যবসার জন্য ফ্ল্যাট বেছে নিয়েছে। তারা এক-একজন একাধিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মাদকের আখড়া গড়ে তুলেছে। রাজধানীর এরকম শত শত ফ্ল্যাট রয়েছে। তবে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যখনই তথ্য পাচ্ছে অভিযান চালাচ্ছে।
এরকম আরেক মাদক ব্যবসায়ীর নাম শিলামণি। রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার আইজি গেট, বংশাল, নবাবপুর রোড ও কেরানিগঞ্জে বিভিন্ন ফ্ল্যাট ভাড়া করে মাদক ব্যবসা চালায় এই নারী। পুরান ঢাকার এক সময়ের ডাকাত মাসুদের অন্যতম সহযোগী শিলামণি। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ধামরাইয়ে সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির সময় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাসুদ নিহত হয়। এ সময় তার সহযোগী শিলামণিসহ পাঁচ জনকে আটক করা হয়। মাসুদের হাত ধরেই অন্ধকারে পা রাখে শিলা। ওই সময়ে মাসুদের মাদক ব্যবসা পরিচালনা করতো। মাসুদ নিহত হওয়ার পর নিজে কারাগার থেকে বের হয়ে শুরু করে মাদক বাণিজ্য। সূত্রমতে, বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট বাসা ভাড়া করে রাতের আঁধারে আসর জমিয়ে তোলে এসব বাসায়। মদের সঙ্গে মনোরঞ্জনের জন্য  থাকে এক শ্রেণির সুন্দরী। রাতভর পার্টি হয় তার বাসায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেনে যাওয়ার পর পরই গেণ্ডারিয়ার বাসাটি পরিবর্তন করে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সামছুল আলম বলেন, শিলামণি আমাদের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট বাসা নিয়ে মাদক ব্যবসা করে। শিলা অত্যন্ত চালাক নারী। যে কারণে তাকে গ্রেপ্তার করতে বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ওয়ারীর ৫০/১ উত্তরমৈশুণ্ডীর ৭ তলা ভবনের ৬ তলার ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন থেকে মাদক ব্যবসা করছিল একটি চক্র। গত ৪ঠা এপ্রিল এতে অভিযান পরিচালনা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ১০,২০০ পিস ইয়াবা ও পাঁচ গ্রাম হেরোইনসহ আমির হোসেন রোকন নামে এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয় ওই ফ্ল্যাট থেকে। রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকা উত্তরা। উত্তরার ছয় নম্বর সেক্টরের ১০ নম্বর সড়কের ৪১ নম্বর বাড়ি। এখানে দ্বিতীয় তলায় একটি কোচিৎ সেন্টার। আসা-যাওয়া করেন শিক্ষার্থীরা। নিচ তলায় আনোয়ার হোসেনের অফিস। আশপাশের লোকজন তাকে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী হিসেবেই চিনেন। অবাধে ওই ভবনে তরুণ-তরুণীরা যাতায়াত করেন। কোচিং সেন্টার থাকায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ জাগে না কারও। ফ্ল্যাটে জমতো জম্পেশ আড্ডা। সেখানে বসেই মাদকের আড্ডায় মশগুল হতেন সেবনকারীরা। তাদের বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী। সেই আড্ডায় অংশ নেয়া এক তরুণী জানান, ছেলে-বন্ধুর সঙ্গে সেখানে যেতেন তিনি। ফ্ল্যাটটি যথেষ্ট নিরাপদ হওয়ায় অনেকেই আড্ডা দিতেন সেখানে। মূলত ওই আড্ডায় সেবন করা হতো ইয়াবা ও ফেন্সিডিল। এভাবেই দিনের পর দিন গার্মেন্ট ব্যবসার আড়ালে চলছিল মাদক বাণিজ্য। উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে এই বাণিজ্য করে যাচ্ছিল আনোয়ার। তবে ওই ফ্ল্যাটে অচেনা কেউ যেতে পারতেন না। অচেনাদের জন্য উত্তরা পশ্চিম থানায় ছিল আরেকটি ফ্ল্যাট। তবে সেখানে মূল হোতারা থাকতো না। বিষয়টি নজরে পড়ে র‌্যাবের। শুরু হয় অনুসন্ধান। পাইকারি ক্রেতা সেজে গ্রেপ্তার করা হয় আনেয়ারের সহযোগী শরিফুল ইসলামকে। গ্রেপ্তারের পর গত ১লা মার্চ রাতে উত্তরার ছয় নম্বর সেক্টরের ওই বাসায় নিয়ে যায় র‌্যাব সদস্যদের। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মাদক সম্রাট আনোয়ার হোসেনকে। জব্দ করা হয় ৭৮০ বোতল ফেন্সিডিল। ওই বাসা থেকে ফেন্সিডিলের খালি বোতল, অব্যবহৃত কর্ক এবং হেয়ার ড্রায়ার জব্দ করা হয়। র‌্যাব জানায়, আনোয়ার এবং তার সহযোগী শরিফুল বিভিন্ন কৌশলে জয়পুরহাট সীমান্ত থেকে ফেন্সিডিল ঢাকায় নিয়ে আসে। তারা বিশেষ কৌশলে পুরানো ফেন্সিডিলের বোতল সংগ্রহ করে অব্যবহৃত ছিলযুক্ত ছিপি লাগিয়ে ভেজাল ফেন্সিডিল উৎপন্ন করে বিক্রি করতো। মাদক সম্রাট আনোয়ার হোসেনের বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থানার রতনপুরে। তার সহযোগী শরিফুলের বাড়ি দিনাজপুর নবাবগঞ্জের মালিপাড়া গ্রামে।
একইভাবে উত্তরা, গুলশান, বনানীতে অভিজাত পার্টি বসে ফজলুল করিমের ফ্ল্যাটে। রাতভর হয় মদের পার্টি। ইয়াবা, ফেন্সিডিলসহ বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ। তবে ঘন ঘন বাসা পরিবর্তন করার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মদের পার্টি হয় বিভিন্ন রিসোর্টেও। এরমধ্যে একটি তুরাগ রিক্রিয়েশন রিসোর্ট। রাজধানীর রূপনগরের বেড়িবাঁধ এলাকা পেরিয়ে বিরুলয়া ব্রিজ সংলগ্ন এই রিসোর্ট। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আয়োজন করা হয় ডিজে পার্টির। সুন্দরী চির্য়াসগার্লদের টানে ও অবাধে মাদক সেবনের জন্য তরুণ-তরুণীরা জড়ো হন পার্টিতে। নিচের ফ্লোরে রাতব্যাপী চলে নাচ-গান ও মাদব সেবন। দ্বিতীয় তলার বিভিন্ন কক্ষে রাত্রিযাপন করেন তরুণ-তরুণীরা। এরকম পার্টি প্রতি রাতেই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হচ্ছে। পার্টির নামে চলছে অবাধে মাদকসেবন। আয়োজক ও চিয়ার্সগার্লদের মাধ্যমে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সরবরাহ করা হয় এসব পার্টিতে। একইভাবে গুলিস্তানের হোটেল স্বাগতমে নির্বিঘ্নে হচ্ছে মাদক বাণিজ্য। কক্ষে বসেই মাদক সেবন করা হয় ওই হোটেলে। একাধিকবার ওই হোটেলে অভিযানও করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, রাজধানীর অনেক বাসাবাড়িতে মাদক ব্যবসা হচ্ছে। র‌্যাব প্রায়ই মাদক জব্দ করছে। মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করছে। বাসা-রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থানে মাদক বাণিজ্য প্রতিরোধে র‌্যাব সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি। র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ১০৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। জব্দ করা হয়েছে ১৩,৪৭,৬৩৮ পিস ইয়াবাহর বিপুল মাদকদ্রব্য। জব্দকৃত মাদকদ্রব্যের বেশিরভাগই পরিবহনকালে ও বিভিন্ন বাসায় বা ফ্ল্যাটে মজুদ করে বিক্রির সময় জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটা বড় অংশ ঢাকা থেকে জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.