ডিসেম্বর ৩, ২০২০

বিএনপি’র নগর কমিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

১ min read

 নতুন আলো নিউজ ডেস্ক: সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গতিসঞ্চার ও নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে ঢাকা মহানগরকে দুই ইউনিটে ভাগ করেছে বিএনপি। দুই বছর ৮ মাস পর মঙ্গলবার রাতে ঢাকা দক্ষিণের ৭০ সদস্য ও ঢাকা উত্তরের ৬৬ সদস্য বিশিষ্ট আংশিক কমিটিও ঘোষণা করেছে দলটি। আগামী এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনেরনির্দেশনাও দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে মহানগরের নতুন নেতৃত্ব। ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের মহানগর কেন্দ্রিক সাবেক নেতাদের অনেকেই স্থান পেয়েছেন নগর কমিটির দুই ইউনিটে। কেন্দ্রীয় তারকা নেতাদের চেয়ে বেছে নেয়া হয়েছে নগর রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতাদের। তবে কমিটিতে কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে হতাশ একাধিক নগর নেতা ও তাদের অনুসারীরা। পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি নবীউল্লাহ নবী। পদ-পদবি নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছু ক্ষোভ-হতাশা থাকলেও সার্বিকভাবে ইতিবাচক আলোচনাই বেশি। মঙ্গলবার রাতে কমিটি ঘোষণার পর গতকাল সকাল থেকেই নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ছিল নগর নেতাকর্মীদের ভিড়। নতুন কমিটি নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সবমিলিয়ে নতুন কমিটি নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে সাদেক হোসেন খোকা ও আবদুস সালামের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে হাইপ্রোফাইল আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৮ জুলাই। যদিও ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসের টানা আন্দোলনে আহ্বায়ক কমিটির বেশির ভাগই ছিলেন আত্মগোপনে। ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার দায়িত্ব দেয়া হলেও আড়াই বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি তারা। এমন পরিস্থিতিতে মহানগর বিএনপিকে ভেঙে দুই ইউনিট করার প্রস্তাব আসে দলীয় ফোরামে। দীর্ঘদিন বিচার-বিশ্লেষণ করে সে প্রস্তাব বাস্তবায়ন করে বিএনপি।
ঢাকা দক্ষিণের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি এবং সর্বশেষ মহানগর আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন তিনি। বিগত আহ্বায়ক কমিটিতে এই নেতাকে সদস্য সচিব হিসেবে মেনে নিতে পারেননি আহ্বায়ক। সে দূরত্ব দিনদিন বেড়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল নগর বিএনপির রাজনীতিতে। তবে বিএনপির রাজনীতিতে বিশ্বস্ত এ নেতার ওপর প্রথম থেকেই আস্থা ছিল দলের শীর্ষ নেতৃত্বের। নতুন কমিটি গঠনে ঢাকা দক্ষিণে সভাপতি হিসেবে তাই নেতাকর্মীদের কাছে অনুমিতই ছিল তার নাম। ঢাকা দক্ষিণে সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা আবদুস সালাম, সালাহউদ্দিন আহমেদ ও কাজী আবুল বাশারের চেয়ে তিনিই ছিলেন এগিয়ে। দক্ষিণে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ও ডিসিসি’র সাবেক কমিশনার সূত্রাপুরের কাজী আবুল বাশার। প্রবীণ এ নেতা এককালে সাদেক হোসেন খোকার ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তিনি এখন মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ। দক্ষিণে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় ছিলেন ডেমরা বিএনপি’র সভাপতি নবী উল্লাহ নবী, মতিঝিল বিএনপি’র সভাপতি হারুনুর রশীদ হারুন ও খিলগাঁওয়ের ইউনুস মৃধা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনজনকে পেছনে ফেলে সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব পেয়েছেন সভাপতি পদ প্রত্যাশী কাজী আবুল বাশার। নবী ও ইউনুস মৃধা সহ-সভাপতি পদ পেলেও পিছিয়ে পড়েছেন হারুন। নবী উল্লাহ নবী ইতিমধ্যে পদত্যাগের ইঙ্গিত দিলেও হতাশ অন্য দুই নেতা ও তাদের অনুসারীরা। এছাড়া দক্ষিণের কমিটিতে সহ-সভাপতি পদের দায়িত্ব পেয়েছেন ২৬ জন। লালবাগের সাবেক এমপি প্রয়াত নাসিরউদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আখতার কল্পনা, যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক সভাপতি হামিদুর রহমান হামিদ ও ডিসিসি’র কয়েকজন সাবেক কমিশনার রয়েছেন এ তালিকায়। ঢাকা দক্ষিণের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদের দায়িত্ব পেয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ীর সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ কোনো পদ না পেলেও সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন তার ছেলে তানভীর আহমেদ রবিন।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তরের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপি’র ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও ডিসিসি’র সাবেক কমিশনার বাড্ডার এমএ কাইয়ুম। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে লড়া সাবেক এ কমিশনার প্রায় দুই বছর ধরে অবস্থান করছেন মালয়েশিয়ায়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে গুলশানে ইতালির নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যাকাণ্ডে তার নামযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। সাংগঠনিক যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার কারণে মহানগর উত্তরের সভাপতি হিসেবে প্রথম থেকে তার নামই এগিয়ে ছিল আলোচনায়। শেষ পর্যন্ত অনুমিত হিসেবে তিনিই দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে বিদেশে অবস্থান করে কিভাবে দলকে শক্তিশালী ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন তিনি। ডিসিসি উত্তরে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচন করা তাবিথ আউয়ালের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত কমিটির কোনো পদেই নেই তিনি। অন্তত সহ-সভাপতি পদের মাধ্যমে নগর রাজনীতিতে তার সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন অনেকেই। একইভাবে ঢাকা মহানগর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম নগরের দুই অংশেই সভাপতি পদ প্রত্যাশী ছিলেন। তার নামও নেই উত্তর-দক্ষিণের কোনো কমিটির তালিকায়। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন ডিসিসি’র আরেক সাবেক কমিশনার মিরপুরের আহসান উল্লাহ হাসান। দীর্ঘদিন থেকে সাধারণ সম্পাদক পদে তার নামটিই ছিল সবচেয়ে আলোচিত। তবে এ পদে আলোচনায় থাকা দুইজনের একজন মুন্সী বজলুল বাসিত আঞ্জু সিনিয়র সহ-সভাপতি পদ পেলেও পদবঞ্চিত হয়েছেন তেজগাঁওয়ের আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার। কমিটি ঘোষণার পর বর্তমানে কারাগারে থাকা এ নেতার অনুসারীরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে তাদের প্রত্যাশা উত্তরের আংশিক কমিটিতে শূন্য রাখা প্রথম ও দ্বিতীয় যুগ্ম সম্পাদক পদের প্রথমটি পাবেন তিনি। এছাড়া উত্তরের আংশিক কমিটিতে সহ-সভাপতি ২৩ জন। তাদের মধ্যেও রয়েছেন ডিসিসি’র বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কমিশনার।
এদিকে দুই ইউনিটে ভাগ করার পর ঢাকা মহানগর বিএনপি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা মহানগর বিএনপি’র কমিটি পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চেয়ারপারসনের তত্ত্বাবধানে সত্যিকার অর্থে ভালো কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। আশা করি, দু’ভাগে বিভক্ত বিএনপি’র ঢাকা মহানগর কমিটি আগামী দিনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সফল হবে। নতুন কমিটির বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, কমিটিতে পরীক্ষিত সৈনিকদের স্থান দেয়া হয়েছে। কমিটির বেশির ভাগ পদেই তরুণদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। যেসব পদ এখনও শূন্য আছে সেসব পদেও যোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ আছে। মহানগর উত্তরের নতুন সভাপতি এমএ কাইয়ূম দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। ইতিমধ্যে একটি হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। স্বশরীরে অনুপস্থিত এ নেতাকে নিয়ে কিভাবে দল শক্তিশালী করা সম্ভব- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আলমগীর বলেন, মিথ্যা মামলায় যাদের দূরে রাখা হয়েছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। তারা যে ভূমিকা রাখতে পারবেন না তা নয়, বরং তারাও একটি বড় ভূমিকা রাখবেন বলে বিশ্বাস করি। অতীত ইতিহাস বলে, শুধু কাছে থাকলেই ভূমিকা রাখা যাবে- তা ঠিক নয়। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন- নবী খান সোহেল বলেন, শেষপর্যন্ত ক্ষোভ, দুঃখ থাকবে না। বরং ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি আদায়ে সবাইকে নিয়েই আগামীর আন্দোলন করা হবে। তাছাড়া যারা পদ পায়নি তাদের এখনও অনেক সুযোগ আছে। সে ব্যাপারে বিবেচনা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.