নভেম্বর ১, ২০২০

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দিতে হচ্ছে অনেক তাজা প্রাণ

১ min read

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দিতে হচ্ছে অনেক তাজা প্রাণ ,এক সপ্তাহে প্রাণ গেছে তিনজনের

কোন্দলের কারনে প্রতিনিয়ত  দিতে হচ্ছে অনেক তাজা প্রাণ| থামছে না আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দন্দ্ব কোন্দল। কিছুদিন পরপর দেশের কোথাও না কোথাও নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়াচ্ছেন নেতা-কর্মীরা।
দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, দলের ভেতরে আধিপত্য বিস্তারের কোন্দল এত গভীরে চলে গেছে যে সংঘাত থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যতটা সম্ভব শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।
গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কুমিল্লার মুরাদনগরে এবং নরসিংদীর রায়পুরায় ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে তিনজনের প্রাণ গেছে। এই এক সপ্তাহের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে সুইমিংপুল নির্মাণ বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে থাকা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। এটি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফসল বলে মনে করছেন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।
দলীয় সূত্র জানায়, কুমিল্লা উত্তর জেলা সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের মধ্যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব চলছে। কুমিল্লা মহানগরে সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও প্রবীণ নেতা আফজল খান পরিবারের দ্বন্দ্বও পুরোনো। নরসিংদীতে জেলা সভাপতি নজরুল ইসলাম (হিরু) ও সাধারণ সম্পাদক মতিন ভূঁইয়ার সঙ্গে সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের (রাজু) সমর্থকদের বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা। দ্বন্দ্বের কারণে পুনরায় আওয়ামী লীগের শিল্পবিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে আবদুস সাত্তার নিজ নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি। পিরোজপুরে সাংসদ এ কে এম এ আউয়াল ও তাঁর আপন ভাই পৌর মেয়র হাবিবুর রহমানকে ঘিরে আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত। বলেশ্বর সেতু ও দুটি ফেরিঘাটের টোল আদায় করা নিয়ন্ত্রণে থাকবে—এই নিয়ে মূলত দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের সঙ্গে জেলা সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্ব এখনো চলমান। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে রবিউল-সমর্থকেরা মন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট করছেন।
টাঙ্গাইলে সাংসদ আমানুর রহমান খান খুনের মামলায় কারাগারে। পরিবারের সদস্যরা পলাতক। এরপরও তাঁদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে ঘাটাইল উপজেলার সম্মেলন তিনবার পেছানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এমন কোনো জেলা পাওয়া যাবে না, যেখানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নেই। কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছেন। ফলে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এখন আসলেই অসম্ভব।
দলীয় সূত্র জানায়, গত বুধবার আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সভায় এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ে আলোচনা হয়। দ্বন্দ্বে লিপ্ত জেলাগুলোর নেতাদের পর্যায়ক্রমে ঢাকায় ডেকে এনে বুঝিয়ে-সুজিয়ে মীমাংসা করার সিদ্ধান্ত নেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
ওই সভায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকেরা দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের কয়েকটি জেলার ওপর সাংগঠনিক প্রতিবেদন তুলে ধরেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পাঁচটি জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা নেতাদের ঢাকায় ডাকার সিদ্ধান্ত নেন। আগামীকাল ২৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার নেতাদের নিয়ে বসবেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর ২৪ এপ্রিল যশোর, ২৫ এপ্রিল সাতক্ষীরা ও ১৭ এপ্রিল নীলফামারী জেলার নেতাদের ঢাকায় ডাকা হয়েছে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দলের অন্যতম মুখপাত্র মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সংগঠন করি। দ্বন্দ্ব-সংঘাত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড দিয়েই বন্ধের চেষ্টা করছি। সারা বিশ্বেই সামাজিক অস্থিরতা-উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। আমরা চেষ্টা করছি, চেষ্টা চালিয়ে যাব।’
আওয়ামী লীগের সূত্র বলছে, মোটাদাগে এসব সংঘাতের মূলে রয়েছে উন্নয়মূলক কর্মকাণ্ডের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, হাঁট-ঘাট-টার্মিনালের টোল ও চাঁদার নিয়ন্ত্রণ ও ভূমি দখল। এর বাইরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনও দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়িয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিযোগিতাও দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল শুক্রবার নোয়াখালীতে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলে সব সময় কিছু পরগাছা ঢুকে যায়। এরা জায়গায় জায়গায় সমস্যা সৃষ্টি করে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসে, তখন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এ নিয়ে পুরোনোদের সঙ্গে নতুনদের রেষারেষি চলতে থাকে। তিনি বলেন, প্রত্যেকের সম্পর্কে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ও দলীয়ভাবে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। কিছু কিছু ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হচ্ছে। বিশৃঙ্খলা ও অপকর্মের জন্য অন্যদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে ৬৩ বার সংঘাতে জড়িয়েছে। এসব সংঘাতে প্রাণ গেছে ১১ জনের। আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৯১৪ জন।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দল বড়, জনপ্রতিনিধি বেশি। ফলে ক্ষমতার লড়াই থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সংঘাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, নিজেদের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকলে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যাবে।’ তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সবকিছুর তথ্য সংগ্রহ করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.