অক্টোবর ২২, ২০২০

কুমিল্লার মুরাদনগরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে

১ min read

নতুন আলো নিউজ ডেস্ক:স্থানীয় এমপি ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন ও জেলা উত্তর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকারে বিভক্ত মুরাদনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। এক পক্ষ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংবাদ সম্মেলন করেছে। অপর পক্ষ নিজেদের আধিপত্য ও প্রভাব এলাকায় আরো দৃশ্যমান করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
কুমিল্লার বড় উপজেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মুরাদনগর উপজেলা। ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে এ উপজেলা গঠিত। এখানে থানা রয়েছে দুটি। এখানে দীর্ঘদিন ধরে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকারের মধ্যে রয়েছে গ্রুপিং। এই দুই শীর্ষ নেতার গ্রুপিংয়ের কারণে মুরাদনগরে একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। জেলা থেকে কেন্দ্র বহুবার চেষ্টা করেও দুই নেতার বিরোধ মেটাতে পারেনি। পুরো উপজেলা আওয়ামী লীগ এই দুই নেতায় বিভক্ত হয়ে আছে। জাহাঙ্গীর আলম সরকারের বিরোধিতার কারণে ২০১৪ সালের আগে দু’বার এমপি নির্বাচন করেও জয়লাভ করতে পারেননি ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন- অভিযোগ হারুন গ্রুপের। অপর দিকে টাকা নিয়ে মনোনয়ন কেনার কারণে জলপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও এ সময় দলীয় মনোনয়ন পাননি জাহাঙ্গীর আলম সরকার- এ অভিযোগ জাহাঙ্গীর গ্রুপের। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে এখানে মনোনয়ন পায় জাতীয় পার্টি। ফলে এখানে কোনো নৌকার কাণ্ডারী ছিলেন না। যদিও এই দুই নেতাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন দলীয় প্রতীক নৌকা পাওয়ার জন্য। কুমিল্লা ৩ মুরাদনগরের এই আসনটি জাতীয় পার্টির (এরশাদ) আক্তার হোসেনকে ছেড়ে দেয়ায় এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থ সম্পাদক ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকারের ছেলে ড. আহসানুল আলম কিশোর। সেই নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থী জাপার আক্তার হোসেন তৃতীয় হন। বিজয়ী হন ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হন জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে ড. কিশোর। মূলত এখান থেকেই হারুন বনাম জাহাঙ্গীর সরকারের গ্রুপিং আরো চাঙ্গা হয়। নির্বাচনের পর স্থানীয় এমপি ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন নিজেকে আওয়ামী লীগের এমপি পরিচয় দিয়ে তার কার্যক্রম চালালেও জাহাঙ্গীর সরকার গ্রুপ বলতেন তিনি আওয়ামী লীগের কেউ না, স্বতন্ত্র এমপি। এ নিয়েও দুই নেতার কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সবশেষে ৩ মে বুধবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে সব নেতা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে এমপি হয়েছিলেন এমন ১১ জন এমপি আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যোগ দিয়েছেন। এখন তাদের চূড়ান্তভাবে দলে নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ খবরে আবারো রাজপথে নামে জাহাঙ্গীর আলম সরকার।
৪ মে বৃহস্পতিবার কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার পক্ষের আওয়ামী লীগ নেতারা ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে স্থানীয় এমপি ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুনের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, গত সংসদ নির্বাচনে ইউছুফ আব্দুল্লাহ হারুন দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে এমপি হয়েছেন। এমপি হওয়ার পর থেকে স্থানীয় বিএনপির লোকজনকে নানা প্রকারের সুযোগ সুবিধা দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করে রেখেছেন। উপজেলার বিভিন্ন কাজের টেন্ডার থেকে শুরু করে থানা, ইঞ্জিনিয়ার, পিআইও অফিস বিএনপির লোকজন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যার ফলে উপজেলার স্থানীয় আওয়ামী লীগ বর্তমানে বিরোধী দলের ভূমিকায় আছে বলে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে।
গত মাসে উপজেলার রহিমপুর গ্রামে যে ডাবল মার্ডার হয়েছে তা ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুনের অনুসারীদের ইশারায় ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বা হত্যা হয়েছে তারা আওয়ামী লীগের কেউ না। স্থানীয় মানুষ বলাবলি করছেন, ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন আগামী নির্বাচনে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন। এমন অবস্থায় থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগকে রক্ষার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন জাহাঙ্গীর সরকার গ্রুপ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, কুমিল্লা-৩ মুরাদনগর আসন থেকে গত সংসদ নির্বাচনে ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন ও আমি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করলে, দল আমাকে নৌকা মার্কায় মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টিকে আসনটি দিয়ে দেয়া হয়। আমি দলীয় আদেশ মতে নির্বাচন থেকে বিরত থাকি। কিন্তু ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন দলের প্রতি আনুগত না থেকে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করে করে এমপি হন। আমি আশা করছি প্রধানমন্ত্রী আগামী সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৩ মুরাদনগর আসন থেকে আমাকে নৌকা মার্কা মনোনয়ন দেবেন। কারণ একমাত্র আমিই তৃণমূলের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে মুরাদনগর তথা কুমিল্লা উত্তর জেলার আওয়ামী লীগকে চাঙ্গা রেখেছি সাংগঠনিকভাবে।
অপর দিকে স্থানীয় সাংসদ ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আর স্বতন্ত্রে নেই। গত বুধবার আওয়ামী লীগে যোগদান করেছি। আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে কিছু নেতাকর্মী যে অভিযোগ এনেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কিছু নেতাকর্মী আছে যারা আমার কাছে অনৈতিক সুবিধা চেয়ে পায়নি তারাই আমার বিরোধিতা করছে। আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। আমি আশা করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৩ মুরাদনগর আসন থেকে আমাকে নৌকা মার্কায় মনোনয়ন দেবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুরাদনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, বর্তমান অবস্থায় বোঝা যাচ্ছে, মুরাদনগর আওয়ামী লীগের জন্য সামনের দিনগুলো খারাপ হয়ে আসছে। কেন্দ্র এখনই যদি দুই নেতার বিরোধ মেটাতে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ না করেন তাহলে এখানে কঠিন মূল্য দিতে হবে আওয়ামী লীগকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.