অক্টোবর ২৮, ২০২০

ইসলামে হালাল হারামের মূলনীতি

১ min read

নতুন আলো নিউজ ডেস্ক:ইসলামে মানুুষে মানুষে ভেদাভেদ নেই। ধনী-গরিবে তারতম্য নেই। ইসলামের বিধান সবার জন্য সমান। নামাজ যেমন গরিব-ধনী সবার ওপর ফরজ, তেমনি সুদ বর্জন এবং হালাল হারামও।
ইসলাম ব্যক্তিবিশেষের পূজা করে না। কারও মন রক্ষায় ইসলামের বিধান পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না।

ইসলাম সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে হালাল উপার্জন ও গ্রহণের প্রতি। বর্জন করতে বলে হারামকে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। যা হালাল তাই গ্রহণ করো এবং যা হারাম তা বর্জন করো।’ (ইবনে মাজাহ : ২১৪৪)। মানবতার ধর্ম ইসলাম মানুষের কল্যাণে জীবিকা অন্বেষণের তাগিদে হালাল পথ দেখিয়েছে। সুস্পষ্ট নীতি-নির্ধারণ করেছে। পার্থক্য তুলে ধরেছে হালাল হারামের। দিয়েছে কিছু মূলনীতি।

বস্তু অবৈধ হিসেবে প্রমাণিত না হলে সব কিছুই বৈধ : জগতের বুকে সব সৃষ্টিজীব, সৃষ্টি, আবিষ্কার, উদ্ভাবন, আসবাব মূলগতভাবে বৈধ। জগতে সব নির্মাণ হয় বৈধতার ওপর। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো সৃষ্টিকে অবৈধ হিসেবে প্রমাণিত না করা যাবে, তাহলে সেটা বৈধ থাকবে। কেননা মৌলিকভাবে সব কিছুই বৈধ। ইমাম সুয়ূতি বলেন, ‘বস্তুর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো বৈধ।’ (আল আশবাহ লিস সুয়ূতি : ১৩৩)।

হালাল ও হারাম নির্ধারণের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর : জগৎ আল্লাহর সৃষ্টি তাই বিধান চলবে তার। সৃষ্টির ভালোমন্দ তিনি জানেন। তিনি সব কিছুতে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন। ধরার কোন বস্তু হালাল আর কোন বস্তু হারাম, তা নির্ধারণ করবে একমাত্র আল্লাহ। কোনো মানুষ হালাল-হারামের নির্ধারক নন। যুক্তি, বাকবিত-া করে কোনো বিষয়কে হালাল বা হারাম করা যাবে না। শরিয়ত যেভাবে হালাল হারাম নির্ধারণ করেছে, সে নীতির আলোকে পৃথিবী চলবে। শরিয়ত নির্ধারক একমাত্র মহান আল্লাহ। কোরআনে পঠিত হয়েছে, ‘বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ।’ (সূরা আনয়াম : ৫৭)।

হালালকে হারাম অথবা হারামকে হালাল মনে করা শিরকতুল্য : জগতের বিধিবিধান নির্ধারণ করেছেন পৃথিবীর অধিশ্বর। মানুষের কথা ভেবে তিনি দিয়েছেন মানবউপকারী বিধান। মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন ধরার সব। মানুষের হাতে সমর্পিত করেছেন তামাম সৃষ্টি। তাদের স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, সঠিক পথ এবং শরিয়তের পথ।  বলেছেন, তাঁর বিধানে কোনো পরিবর্তন হয় না। যাকে তিনি হারাম করেছেন আজীবন হারাম থাকবে। তেমনি হালালের বিধান। কিন্তু এর বিপরীত মনোভাব পোষণ করা আল্লাহর বিধান অস্বীকারের নামান্তর এবং তা হারাম ও শিরক। শিরক সবচেয়ে বড় কবিরা গোনাহ। আল্লাহ শিরক গোনাহ মাফ করেন না।

কোনো কিছু হারাম হয় বস্তুর ক্ষতি ও অপবিত্রতার কারণে : প্রত্যেকটা বস্তুর আবির্ভাব হয় বৈধতার ওপর। তবে একটি বৈধ বস্তু কখনও কোনো পারিপার্শ্বিকতার কারণে অবৈধ হয়ে যায়। হারাম হয়ে যায় বস্তুর ক্ষতি ও অপবিত্রতার লক্ষণে। যেমনÑ কুকুর একটি অপবিত্র প্রাণী, কারণ তার মাংস মানবজাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সুতরাং কুকুর হারাম। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হয়, যা কণ্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চাসন থেকে পতনের ফলে মারা যায়, যা শিংয়ের আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে, কিন্তু যাকে তোমরা জবেহ করো। যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে জবেহ করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর দ্বারা বণ্টন করা হয়। এসব গোনাহের কাজ।’ (সূরা মায়েদা : ০৩)।

হালাল জিনিস যথেষ্ট পরিমাণে আর হারাম জিনিস অতিরিক্ত পর্যায়ে রয়েছে : এ সমাজে ছড়ানো আছে হালাল হারামের বিবর্ণ ক্ষেত। তবে হালালের তুলনায় হারামের আসবাব সরঞ্জাম বেশি। হালালের ক্ষেত্র হলোÑ ব্যবসা, কৃষিক্ষেত্র, শিল্প-কারখানা ও পেশাগত ক্ষেত্র। হারামের ক্ষেত্র হলো, মাদকদ্রব্যের ব্যবসা, সুদের ব্যবসা, অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ কুক্ষিগত করা, যেমনÑ ঘুষ, চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি। হারাম জিনিসের উৎপাদন ও বিপণন, পতিতাবৃত্তি, দেহ ব্যবসা, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি, ধোঁকাবাজি, জুয়া, লটারি, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়, অনিশ্চয়তার ব্যবসা, নিজের অধিকার/দখলভুক্ত নয় এমন সম্পদ বিক্রয়, পরিমাণ ও পরিমাপে কম দেয়া, অবৈধ মজুদদারি, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বাড়ানো, মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি করা ইত্যাদি।

হারাম জিনিসের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী জিনিসও হারাম : যেসব জিনিস মানুষকে হারামের দিকে টেনে নিয়ে যায়, হারাম কাজ করতে উৎসাহিত করে তা হারাম। জুয়া মানুষকে হারাম কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। চুরি করতে শেখায়। পরের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করতে প্ররোচিত করে। সুতরাং জুয়া হারাম। আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমিনগণ! জেনে রাখ, মদ, জুয়া, মূর্তি এবং পাশা খেলা, ফাল গ্রহণ ইত্যাদি অতি অপবিত্র জিনিস ও শয়তানের কাজ। অতএব তোমরা তা পরিত্যাগ করো। তবেই তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে।’ (সূরা মায়েদা : ৯০)।
হারাম দ্রব্যকে মিথ্যাভাবে হালালরূপে প্রদর্শন করাও হারাম : মৌলিকভাবে যে জিনিস হারাম তা গর্হিত, বর্জনীয়। হারাম বস্তুকে মিথ্যাভাবে হালাল বলে চালিয়ে দেয়া কিংবা প্রদর্শন করা জঘন্য অপরাধ। এরকমটি করা হারাম। এখানে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে, প্রতারণা করা হচ্ছে।

ভালো নিয়তে হারাম করলেও তা হালাল হয়ে যায় না : শাক দিয়ে যেমন মাছ ঢাকা যায় না, তেমনি ভালো নিয়তে হারাম কাজ করলেও হালাল হয় না। চুরি যদি কেউ মসজিদ নির্মাণের জন্য করে তাহলে তার চুরি হালাল বা বৈধ হবে না। যদিও মসজিদ নির্মাণ পুণ্যের কাজ।

সন্দেহপূর্ণ জিনিস পরিত্যাগযোগ্য : কোনো বস্তুর বৈধ-অবৈধতা নিয়ে যদি সন্দেহ থাকে, তাহলে বস্তু পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ সন্দেহ মানুষকে হারামের পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। আর বস্তু যদি হালাল হতো, তাহলে তাতে সন্দেহের কোনো লেশ থাকত না। নবী (সা.) বলেন, ‘হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। উভয়ের মাঝে বহু অস্পষ্ট বিষয় রয়েছে। যে ব্যক্তি  গোনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ পরিত্যাগ করে, সে ব্যক্তি যে বিষয়ে গোনাহ হওয়া সুস্পষ্ট, সে বিষয়ে অধিকতর পরিত্যাগকারী হবে।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি  গোনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ করতে দুঃসাহস করে, সে ব্যক্তির সুস্পষ্ট গোনাহের কাজে পতিত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। গোনাহগুলো আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা, যে জানোয়ার সংরক্ষিত এলাকার চারপাশে চরতে থাকে, তার ওই সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে।’ (বোখারি : ২০৫১)।

হারাম নির্বিশেষে সবার জন্যই সমহারে হারাম : ইসলামে মানুুষে মানুষে ভেদাভেদ নেই। ধনী-গরিবে তারতম্য নেই। ইসলামের বিধান সবার জন্য সমান। নামাজ যেমন                  গরিব-ধনী সবার ওপর ফরজ, তেমনি সুদ বর্জন এবং হালাল হারামও।
ইসলাম ব্যক্তিবিশেষের পূজা করে না। কারও মন রক্ষায় ইসলামের বিধান পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। হালাল হারামের ক্ষেত্রে জগতের সেরা নবীকেও ছাড় দেয়া হয়নি। স্ত্রীদের হাতে মধু না খাওয়ার ঘটনাকে উল্লেখ করে আল্লাহ নবীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদের খুশি করার জন্য তা নিজের জন্য হারাম করেছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াময়।’ (আত-তাহরীম : ০১)।

প্রয়োজনে হারামও ক্ষণিকের জন্য হালাল হয়ে যেতে পারে : ইসলাম সহজ সরল ধর্ম। মানুষকে সহজভাবে বেঁচে থাকতে প্রণোদিত করে। মানুষের কল্যাণে নিবেদিত কাজ করে। মানুষের জীবন-মরণের প্রয়োজনে সাময়িকভাবে হারামকেও হালাল করেছে ইসলাম। কোনো অসুস্থ ব্যক্তির আরোগ্য যদি মদ ছাড়া অন্য কোনো বস্তু দ্বারা সম্ভব না হয় এবং তার জীবন যদি বিপন্ন হয় তাহলে তার জন্য ইসলাম মদ পান জায়েজ করেছে। (ফতোয়ায়ে শামী : ৯/৪৮৮)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.