অক্টোবর ২৬, ২০২০

সংবিধান কে ইচ্ছেমতো সংশোধনের ফলে জগা-খিচুড়ি হয়ে যাচ্ছে : প্রধান বিচারপতি

১ min read

নতুন আলো নিউজ ডেস্ক :প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘আমরা বিচার করি বিচার বিভাগের স্বার্থে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে। দেশের জনগণের স্বার্থে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচারপতিরা সব সময় পদক্ষেপ নিয়েছেন। জনগণের স্বার্থ জড়িত থাকলে সেখানে যতই ক্ষমতাশালী থাকুক না কেন, সেখানে বিচারকরা বিচার করতে ভয় পায় না।’

তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর সংবিধান করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই সংবিধান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ইচ্ছেমতো সংশোধন করা হচ্ছে। এখন এটা জগা-খিচুড়ি হয়ে যাচ্ছে।’

মঙ্গলবার (৩০ মে) সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর আপিল শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের ওপর শুনানি চলছে। এই শুনানি আগামী ১ জুন বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। ওই দিন অ্যাটর্নি জেনারেলকে বক্তব্য রাখতে বলা হয়েছে। আদালত বলেছেন, এদিন শুনানি সম্পন্ন করা হবে।

এ মামলার শুনানিতে আদালতকে আইনি সহায়তা করতে সুপ্রিম কোর্টের ১২জন জেষ্ঠ্য আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ১০জন তাদের মতামত উপস্থাপন করেন।

মঙ্গলবার অ্যামিকাস কিউরির বক্তব্য উপস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইন্টারভেনার হিসেবে বক্তব্য রেখেছেন।

মঙ্গলবার আগের দিনের ধারাবাহিকতায় ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ১৬তম সংশোধনীর পক্ষে মত দিয়ে বলেন, ‘বিচারকরা জনগণের হয়ে বিচার কাজ করছেন। তাদের জবাবদিহিতার প্রয়োজন আছে। এই জবাবদিহিতা করতে হবে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের কাছে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এই জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই জাতীয় সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। ফলে ষোড়শ সংশোধনী ওই জায়গাতেই নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সংসদের কাছে জবাবদিহিতা থাকবে। ১৬তম সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ওপর আঘাত করে না।’

তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচারকদের থাকার জায়গা নেই। এই সুপ্রিম কোর্টের একটি প্রশাসনিক ভবন নেই। সুপ্রিম কোর্টের অনেক কর্মকর্তার বসার কক্ষ নেই। অথচ দেশের জন্য বিচার বিভাগের অবদান কোনো অংশেই কম নয়।’

তিনি বলেন, ‘আমি হাজারটা উদাহরণ দিতে পারি যে, আমাদের বিচার বিভাগ বিচারের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত রেখে চলেছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা গোটা দুনিয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। দেশের মানুষ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করলো। এই সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপেই ওই মামলার জট খুলে গেল। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তারিত হয়েছে। এই শহর দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেল। গুলশান ও বারিধারা লেক এবং শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপেই রক্ষা পেয়েছে।’

এরপর সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ রয়েছে। এটার কারণে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ চলে যায়। এটা থাকার কারণে ইচ্ছা থাকার পরও স্বাধীনভাবে নিজ দলের বিরুদ্ধে মতামত দিতে পারেন না। এক্ষেত্রে কি জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে? হবে না। বিচারক অপসারণের বিষয়েও সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারবেন না। ফলে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে না।’

তিনি ১৬তম সংশোধনী বাতিলের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এতবড় বিষয় যে সংশোধনীর মাধ্যমে তা পরিবর্তন করা যায় না।’ তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ে সংসদ সদস্যদের নিয়ে করা মন্তব্য আপনারা বাদ দিতে পারেন।’

এরপর আরেক সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোরই অংশ। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে এটা বলা হয়েছে। এছাড়া এই সুপ্রিম কোর্টই রায় দিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে রেখে দিয়েছে। এ ব্যবস্থাকে আদালত স্বচ্ছ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ অবস্থায় ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিবর্তন আনা হলো। ৯৬ অনুচ্ছেদেও পরিবর্তন আনা হলো। বিভিন্ন সময়ে ৯৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হয়েছে।’

তার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন আছে। সেখানে একটি সিলেবাস আছে। তাতে বলা আছে কোন কোন ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা যাবে। এর বাইরে যেয়ে প্রশ্ন করতে হলে সরকারের অনুমতি নিতে হয়। কমিশনের চেয়ারম্যানকে বিদেশ যেতে হলে সরকারের অনুমতি নিতে হয়। হাত-পা এমনভাবে বেঁধে রেখেছেন যে –, আপনি বুঝছেন তো।’

এসময় ফিদা এম কামাল বলেন, ‘হাত-পা বেঁধে রাখলে তো সাঁতার কাটা যাবে না।’

অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্য উপস্থাপন শেষ হলে আদালতে উপস্থিত সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইন্টারভেনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু সংবিধানের সংশোধনীর প্রয়োজন হলে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব কে করবে। তাদের পক্ষে সংসদ সদস্যরাই প্রতিনিধিত্ব করবেন। কারণ তারাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যরাই জনগণের প্রতিনিধি।’

এসময় প্রধান বিচারপতি তাকে ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং সর্বশেষ সংশোধিত সংবিধানের প্রস্তাবনা পাঠ করতে বলেন। মতিন খসরু উভয় প্রস্তাবনা পড়ার পর তিনি বলেন, ‘৭২ সালের আদি সংবিধানে ফিরে যেতেই এ (১৬তম) সংশোধনী আনা হয়েছে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২ এর ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। আদি সংবিধানে হাত দেওয়া যাবে না। পরিবর্তন করা যাবে না।’

এসময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আদি সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলছেন? হাত দেওয়া যাবে না বলছেন। তাহলে ১১৬ অনুচ্ছেদ কেন পরিবর্তন করলেন। এটার কি দরকার ছিল? নিম্ন আদালতে দ্বৈত শাসন চলছে। তাহলে আইনের শাসন কোথায়? প্রস্তাবনা কেন পরিবর্তন করলেন। এখানে কেন হাত দিলেন। আপনারা কতদূর যেতে পারবেন? সেটাওতো সংবিধানে বলা আছে। সংবিধানে কি পুনঃস্থাপনের কথা বলা আছে? আদি সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ দেখুন। সেখানে প্রতিস্থাপনের কথা আছে। রাজনৈতিক দল ৫ বছরের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বসার পর ইচ্ছামত সংবিধান সংশোধন করেছে। আপনি ৭২ এর সংবিধানের প্রস্তাবনা পড়ুন আর এখনকার প্রস্তাবনা পড়ুন। মিল নেই। দেখবেন, বিভিন্ন সময়ে সংবিধানের পরিবর্তন করতে করতে মূল বৈশিষ্ট্যইতো পরিবর্তন হয়ে গেছে। অনেক বিচ্যুতি (ডেভিয়েশন) ঘটিয়েছেন।’

এসময় আপিল বিভাগের জেষ্ঠ্য বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, ‘আমরাতো জানি যে প্রায় দেড়বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়েছে। সকল পক্ষের মতামত নিয়েই এটা করা হয়েছে। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানিতে বলেছেন যে তড়িঘড়ি করে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি জাতীয় সংসদ বুঝেশুনেই এ সংশোধনী এনেছে।’

তিনি বলেন, ‘রিট আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী ১৬তম সংশোধনী আনার আগে প্রেক্ষাপট হিসেবে দেশের কিছু ঘটনার কথা বলেছেন।’

এসময় আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘আমরা তো একটি মহৎ উদ্দেশ্যে এ সংশোধনী এনেছি। অসৎ উদ্দেশ্যে আনা হয়নি।’

বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, ‘এ মামলা (১৬তম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ) যখন হাইকোর্টে বিচারাধীন তখন তো তাড়াহুড়ো করে আইন করলেন।’

এসময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘একটি নির্বাচনে একটি দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলো। পরের নির্বাচনে বা অন্য কোনও নির্বাচনে একটি দল সরকার গঠন করলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলো না। একটি ঝুলন্ত সংসদ হলো। ওইসময় একজন বিচারকের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ উঠলো। তখন কি হবে? প্রধান বিচারপতি কি করবেন? তিনি বলেন, ৪৫ বছর ধরে দেখছি। এখন এমন হয়েছে যে একজন দাওয়াত দিলে আরেকজন যান না। আপনাদের দাওয়াতে যদি আপনারা না যান।’

এসময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘কিভাবে হবে? একটি দল এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করে না। এখানে আপনাদের পক্ষ হওয়া ঠিক হবে না।’

এসময় আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘আপনারা ডাকলে আসবো।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনাদের যে ইগো সমস্যা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.