অক্টোবর ২৬, ২০২০

পবিত্র রমজান কীভাবে কাটছে ক্ষতিগ্রস্থ হাওরবাসীর ?

১ min read

কিছু দিন আগে আমাদের ওয়ার্ড মেম্বারের মাধ্যমে সরকারের ত্রাণ সহায়তার ৩৮ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা পাওয়ায় একটু শান্তি পাইছিলাম, কিন্তু এখন রমজান মাস কেমনে কাটাই সেই চিন্তায় চোখে ঘুম নাই।সরকার যা দিছিল তা রমজানের আগেই শেষ।আর কেউ আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে না আসায় এখন পান্থা ভাতের সেহরি আর খুড়িয়ে পাওয়া শাকেই ইফতার করতে হচ্ছে।আর কত কষ্ট পেয়ে আমরা রমজান মাস কাটাবো।এ রকম কান্না জড়িত কন্ঠে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনের কথাগুলো তুলে ধরছিলেন পাকনার হাওরে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক জাকির হোসেন।এ বছর তিনি তিন হাল জমিতে বোরো ফসল ফলিয়েছিলেন পরিবারের বার্ষিক চাহিদা মেটানোর আশায়।

 

 

গজারিয়া হাওরের আরেক কৃষক কবির উদ্দিন বলেন,আমি গরিব মানুষ রমজমা ও নিজেরসহ মোট ১০ কেয়ার জমি করছিলাম সবই পানির নিচে তলিয়ে গেছে।মানুষের ঋনের চাপতো আছেই,তারপর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়া বড় কষ্টে আছি।এই পবিত্র রমজান মাসে পরিবারের খাবারের চাহিদা মেঠাতে যেনো আসমান ভেঙ্গে মাথায় পড়ছে।কীভাবে বাকী দিনগুলো পাড় করবো।সামনে ঈদ আসছে বাচ্চা-কাচ্চাদের বুঝ দিব কী করে ভেবে পাচ্ছিনা।

 

 

কথা হয় রাঙ্গিয়ার হাওড়ের ক্ষতিগ্র্স্থ কৃষক মো. আশাদ মিয়ার সাথে তিনি বলেন, আমার ১৪ কেয়ার বোরো জমির সবটাই পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ছোট ভাইকে ঢাকায় পাঠাইয়্যা দিছি,ছোট ছেলেটারে লেখা-পড়া ছাড়াইয়্যা বেকারীর চাকুরিরত দিয়া নিজে এখন রিক্সা চালাইতাছি।খুব কষ্টে আছি, মানুষের ঋনের চাপতো আছেই।সত্য কথা বলতে সেহরী খাই সুটকি দিয়া আর ইফতার করি পান্তা মরিছ দিয়া।আমরা গরিব মরছি আমগর খবর কেডায় লয়।গরিবের আল্লাই আছে।এহেনো পরিস্থিতে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সু-নজরের অনুরোধ হাওড় পারের খেটে খাওয়া মানুষের।

 

 

হালির হাওরের কৃষক কালিবাড়ি বাসিন্দা মো. বাচ্চু মিয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, হালির হাওরে আমার ৫ হাল জমির পুরোটাই পানিতে তলিয়ে গেছে।এখন এমন পরিস্থিতির শিকার হইছি না পারি কইতাম আর না পারি সইতাম,আমরা এখন গরিবওনা ধনিও না,মাঝে পইড়া মরতাছি।পবিত্র রমজান মাসে খুবই কষ্টে আছি।

 

 

জামালগঞ্জের হালির হাওর,পাকনার হাওর,গজারিয়ার হাওর,সন্নার হাওর,মিনি পাকনার হাওর,জুওয়াল ভাঙ্গার হাওর,রাঙ্গিয়ার হাওর।এসব এলাকার লোকদের এখন নুন আনতে পান্তা ফুড়ায়।

 

 

চৈত্র মাসের আগাম বন্যা আর পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৪২ টি হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর হাওর পাড়ে সর্বত্রই বিরাজমান হাহাকার আর করুন আর্তনাদ। গণমাধ্যমসহ ও সামাজিক সকল যোগাযোগ মাধ্যমে এই হাহাকারের চিত্র দেশ-বিদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌছানো হয়েছিল গুরুত্বের সাথে।

 

 

এই অঞ্চলে কৃষকদের একমাত্র উৎপাদিত ফসল হচ্ছে বোরো ধান।প্রত্যেক বছরই ফসলহানীর ঘটনা ঘটলেও কৃষকরা প্রতিবারই অল্প কিছু ধানও তুলেছেন গোলায়। কিন্তু এবছর ধানে তোড় আসার আগেই গোটা জেলার ১ লক্ষ ৬৭ হাজার হেক্টর জমির কাঁচাধান তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েন এই অঞ্চলের কৃষকরা । যেখানে জেলার তিন লক্ষ কৃষকের বুকফাটা আর্তনাদের চিত্র ছিল করুন পীড়াদায়ক। শুধু সোনালী ফসল ধানই তলিয়ে যায়নি।ধান তলিয়ে যাওয়ার পর পরই নদ-নদী খাল-বিল ও হাওরের সব জাতের মাছের বংশও ধ্বংস হয়েছিল বিষাক্ত এ্যামোনিয়া গ্যাসে।এভাবে পর্যায়ক্রমে একে একে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছে বিভিন্ন গৃহ পালিত পশুও।তার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার কাল বৈশাখীর ছোবলে ঘরহারা হয়েছে অনেক পরিবার।ঘুর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছিল হাওর পাড়ের অনেক বসত ভিটা ।যেনো মরার উপর খারা ঘাঁ।খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলায় দেখা দেয় তীব্র খাদ্য সংকট।

 

 

এই অঞ্চলের কৃষকদের করুণ দুঃখ দুর্দশার চিত্র মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী স্বচক্ষে অবলোকন করে গেছেন।এছাড়াও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘুরে গেছেন এই অঞ্চল।সরকারি উদ্যোগে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক পরিবারগুলোর জন্য ১৫ টাকা কেজি দরে ওএমএসর চাল ন্যায্যমুল্যে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে।এর পর পরই সরকারি তহবিল থেকে ত্রাণ সামগ্রীও বিতরণ করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক পরিবাগুলোর মধ্যে।প্রত্যেক মাসে ৩৮ কেজি চাল ও ৫০০ টাকার সরকারি অনুদানের কর্মসুচিও অব্যাহত রয়েছে।

 

 

ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক পরিবারের জন্য সরকারের এমন আন্তরিকতা এই অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিন্তু এই ত্রাণ সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্থ বেশিরভাগ পরিবারের চাহিদার তুলনায় অনেক অনেক কম।সরকারি সহায়তার বাইরে এনজিও সংস্থা ব্রাক যদিও এগিয়ে এসেছে কিন্তু তারা তাদের নিবন্ধিত সদস্যদের বাইরে কাউকে ত্রাণ সহায়তা দেয়নি।এছাড়া আর কোনো বেসরকারি দাতা সংস্থাও এগিয়ে আসেনি ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের মুখে একটু হাসি ফুটাতে।

 

 

শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান।এই মাসে প্রত্যেকটা মুসলিম পরিবারে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুন অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে ।তারপর আবার পবিত্র ঈদের হাতছানি।কিন্তু হাওরে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে অনেকে সব হারিয়ে ঋনের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।কীভাবে মেঠাবেন পরিবারের খাবারের চাহিদা।মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো দুবেলা খেয়ে না খেয়ে আজ পবিত্র রমজান মাসে দিন যাপন করছেন।এ মুহুর্তে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক পরিবারগুলোর জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ও ইফতার সামগ্রীসহ পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ সহায়তার প্রয়োজন।এমতাবস্থায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন দাতা সংস্থাসহ সমাজের প্রত্যেক বিত্তবানরা এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি।নয়তোবা অভিশপ্ত হবে মানবিকতা।

লেখক : জাকারিয়া আহমদ, বিশিষ্ট সাংবাদিক,কলামিষ্ট।

জগন্নাথপুর উপজেলা,সুনামগঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.