নভেম্বর ১, ২০২০

দুদকের জালে চুনোপুঁটি রাঘব বোয়ালরা অধরা –

১ min read

সাবেক তিন এমডি আসামি হলেও এখনো হেফাজতে নিতে পারেনি দুদক সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি বড় ঋণখেলাপি ও কেলেঙ্কারির নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরে আটক ভীতিতে ব্যাংকিং কার্যক্রমে স্থবিরতা

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও রহস্যজনক কারণে রাঘব বোয়ালরা অধরাই রয়ে গেছে। এতে এ অভিযানের মূল লক্ষ্য অনেকটাই ভেস্তে যেতে বসেছে। বরং গডফাদারদের বাদ দিয়ে ছিঁচকে দুর্নীতিবাজদের ধরপাকড়ের হিড়িকে এ খাতে নতুন করে আতঙ্ক ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যা পরোক্ষভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রমে স্থবিরতা ডেকে আনছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া শুধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষে ঋণ দেয়া সম্ভব না হলেও দুদুকের বিভিন্ন মামলায় তারাই ফেঁসে গেছেন। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতি, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় তারাই আসামি হয়েছেন।

গ্রেপ্তারকৃত ব্যাংকারদের মধ্যে চাকরিচ্যুত ও অবসরপ্রাপ্তদের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার থেকে শুরু করে মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও আছেন। তবে নেই শুধু বড় বড় চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা। এ নিয়ে ব্যাংক খাতে ছোট কর্মকর্তাদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
এদিকে গত ২১ জুন প্রথমবারের মতো ১৭ জীবন বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত এক হাজার ৮৬২ কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। দুদকের তদন্তের এ খবরে বীমা খাতেও এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
দুদকের অভিযানে ছোট ছোট আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্তরাই বেশি গ্রেপ্তার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বড় বড় আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এটি দুর্নীতির মূলোৎপাটনে মোটেই সহায়ক নয়। অপরাধী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক_ এমনকি বড় ব্যবসায়ী হলেও যেন তারা ছাড় না পান, সে বিষয়টি দেখতে হবে।
তিনি বলেন, দুদকের উচিত সবার মধ্যে একটি বার্তা পেঁৗছানো যে, দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হয়। একজন দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে অন্যরা এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে একদিকে যেমন স্বাভাবিক অন্যদিকে প্রত্যাশিতও বটে। যাতে করে মানুষ দুর্নীতি থেকে দূরে থাকে। অন্যদিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলো উচ্চপর্যায় হলে কাউকে ছাড় দেবে আবার ছোটদেও ধরা হবে, এটা আইনগত এবং সাংবিধানিকভাবে বৈষম্যমূলক। দুদককে এমন কোনো কাজ করা ঠিক হবে না যেখানে সংস্থাটি আস্থার সংকটে পড়ে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার পর প্রায় দেড়শ’ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ প্রদান, ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, স্বাক্ষর জাল করে গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন, গ্রাহকের এফডিআরের টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অন্য ব্যাংকারদের মধ্যেও।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যায়যায়দিনকে বলেন, ‘জনগণের টাকা যারা লুটপাট করেছে, তাদের বিষয়ে আগের কমিশন কিছু করেনি। বর্তমান নেতৃত্ব যে এ বিষয়ে সক্রিয় হয়েছে, সে জন্য তাদের স্বাগত জানান। আর্থিক খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে অবশ্যই এটি ভূমিকা রাখবে। তবে তাদের সতর্ক হতে হবে, অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। বড় বড় চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের আগে গ্রেপ্তার করতে হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, অভিযানটা ব্যাংকের বিরুদ্ধে নয়, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। এটা ঠিক যে, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছোট-বড় সবাই দুর্নীতিবাজ। তবে বড়দের আটকানোটাই বেশি জরুরি। ছোটদের ধরতে হবে যেন পরে তারা বড় ডাকাত না হতে পারে। তবে বড়দের ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দুদকের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। অনুসন্ধান পর্যায়েই যে কাউকে গ্রেপ্তারের আইনি ক্ষমতা পেয়েছে সংস্থাটি। ক্ষমতার প্রয়োগও করছে তারা। দুদকের অভিযান নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে। ব্যাংকাররাও রয়েছেন আতঙ্কে।
ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে ঋণসংক্রান্ত কোনো কাগজে স্বাক্ষরের আগে একশবার ভাবতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। এতে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভালো গ্রাহকের ঋণ না পাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। যদিও দুদকের দাবি, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যাংকারদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। যারা দুর্নীতি করবেন, তাদের গ্রেপ্তারে এ অভিযান চলবে।
বিপুলসংখ্যক ব্যাংক কর্মকর্তা গ্রেপ্তারের ঘটনায় ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে বলে জানান ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সহ-সভাপতি ও বেসরকারি ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ঋণ-সংক্রান্ত কোনো কাগজে স্বাক্ষর করলে দুদক তাকে ধরে নিয়ে যাবে কিনা, সে বিষয়টি ভাবতে হচ্ছে ব্যাংকারদের। এতে ঋণ অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি ভালো গ্রাহকও ঋণবঞ্চিত হতে পারেন। তাই ব্যাংকারদের গ্রেপ্তারের আগে দুদকের দেখা উচিত, কেউ যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাউকে গ্রেপ্তার করা ঠিক নয়। ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার অভিযোগপত্র দেয়ার পর গ্রেপ্তার করা উচিত। এফআইআর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়। এ অপ্রয়োজনীয় প্রচারে ব্যাংকিং খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। ফলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে দেশের আর্থিক খাতে। দুদকের অভিযান চললেও ব্যাংকগুলোর বড় বড় খেলাপি ও কেলেঙ্কারির নায়কদের কিছুই হচ্ছে না। ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন তারা।
এদিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন তিন ব্যাংকের সাবেক তিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আসামি হলেও তাদের এখনো হেফাজতে নিতে পারেনি দুদক। তারা হলেন সোনালী ব্যাংকের হুমায়ূন কবির, বেসিক ব্যাংকের কাজী ফখরুল ইসলাম ও অগ্রণী ব্যাংকের সৈয়দ আবদুল হামিদ। তবে এমডিদের নামে মামলা করা হলেও সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। যদিও দেশের ইতিহাসে এ দুটি সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা।
তবে আর্থিক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ খাতের চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে অভিযান সুফল দেবে না। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার হলে সেই পর্যায়ে কিছুটা আতঙ্ক ও ভীতি তৈরি হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, দুর্নীতি করে সহজে পার পাওয়া যাবে না এবং যে কোনো সময় তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে এ বার্তা দুর্নীতিবাজদের কাছে পেঁৗছে গেছে।
ব্যাংক খাতে দুদকের অভিযান : অবৈধভাবে ঋণ দেয়ার অভিযোগে গত ২৯ জুন অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ওইদিন দুপুরে চলতি দায়িত্ব পেয়েই বিকালে দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হন ভারপ্রাপ্ত এমডি মিজানুর রহমান খান। পরে তিনি জামিন পান। একই মামলায় গ্রেপ্তার হন মুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানও।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যাংকারদের মধ্যে চাকরিচ্যুত ও অবসরপ্রাপ্তদের পাশাপাশি কর্মরতরাও রয়েছেন। রয়েছেন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার থেকে শুরু করে মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তারাও। উল্লেখযোগ্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চাকরিচ্যুত অতিরিক্ত এমডি মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, প্রথম সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) ইফতেখার হোসেন; স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সাবেক এভিপি, বর্তমানে সিলেট শাখার ম্যানেজার হোসেন আহমদ; এবি ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি ও ঋণ বিভাগের প্রধান, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জিএম (চুক্তিভিত্তিক) বদরুল হক খান; আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শওকত ইসলাম; ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এভিপি মো. ইনামুল হক; সোনালী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখার সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার মো. নুরুজ্জামান; সোনালী ব্যাংকের ভালুকা শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. একরামুল হক খান ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আসাদুজ্জামান; রূপালী ব্যাংকের ঢাকার নবাবগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক ফরিদ আহম্মদ; অগ্রণী ব্যাংকের বংশাল শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার মো. ফারুক আহমেদসহ প্রায় দেড়শ কর্মকর্তা।
নাগালের বাইরে রাঘব বোয়ালরা: ব্যাংক ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া শুধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষে ঋণ দেয়া সম্ভব না। অথচ বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতির ঘটনায় আসামি হয়েছেন শুধু ব্যাংক কর্মকর্তারাই।
বেসিক ব্যাংকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্টতার কথা আলোচিত হলেও তাকে বাদ দিয়েই ৫৬টি মামলা করে দুদক। ওই সব মামলায় ব্যাংকটির ২৭ জন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে আসামি করা হলেও পরিচালনা পর্ষদের কাউকে আসামি করা হয়নি। বর্তমানে মামলাগুলোর অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান পর্যায়ে পাঁচ ব্যাংক কর্মকর্তাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন ১১ জন। অথচ আবদুল হাই কিংবা পরিচালনা পর্ষদের কাউকেই জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করা হয়নি।
বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে আবদুল হাইয়ের দায় থাকার কথা বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও ব্যাংকটিতে ‘হরিলুটের পেছনে আবদুল হাই বাচ্চু জড়িত’ বলে একাধিকবার উল্লেখ করেন। তাকে আসামি না করায় একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে দুদককে কমিটিতে তলব করেন, যদিও দুদকের কোনো কর্মকর্তা হাজির হননি।
হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী বাহারুল ইসলামসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নাম ঘুরেফিরে এলেও তাদের বাদ দিয়েই অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছিল। বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতিতে আসামি হয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারাই।
বড় এই তিন কেলেঙ্কারির ঘটনায় অভিযুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের এমডিদের মধ্যে দুজন দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরেকজন জামিনে।
সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ূন কবিরের মেয়াদকালেই ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় এ ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটে। তবে এ কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশের আগেই অবসরে চলে যান তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে হলমার্ক জালিয়াতির জন্য তাকে প্রধানভাবে দায়ী করা হয়। দুদকের মামলায় তাকে অন্যতম আসামি করা হয়। এরপর দুদক, সোনালী ব্যাংক কেউই তার খোঁজ করে পায়নি। তিনি বর্তমানে কানাডায় রয়েছেন বলে জানা যায়।
ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনায় বেসিক ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে ২০১৪ সালের ২৫ মে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৫ সালে দুদকের করা ৫৬ মামলার ৪৮টিতেই তিনি আসামি। ব্যাংক থেকে অপসারণের পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন এবং তাকে মালয়েশিয়ায় দেখা গেছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদের ছয় বছর মেয়াদে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ হয়েছে দ্বিগুণ, মুনাফা কমেছে পাঁচগুণ। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর গত ৯ জুলাই ছিল তার শেষ কর্মদিবস। তবে এর ১০ দিন আগে তাকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সানমুন গ্রুপকে অবৈধ সুবিধা দেয়ার ঘটনায় ২৯ জুন তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ওই মামলায় ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত এমডি মিজানুর রহমান খান গ্রেপ্তার হলেও সৈয়দ আবদুল হামিদকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি দুদক। ২১ আগস্ট জামিন পান তিনি। ওই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য  বলেন, যারা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম চলছে। কর্মকর্তারা তদন্তের স্বার্থে যে কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করছেন। তিনি বলেন, বড়-ছোট নেই, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাবে, আইন অনুযায়ী দুদক ব্যবস্থা নেবে। দুর্নীতিতে বড় এবং ছোট বলে কিছু নেই।
মামলা ছাড়াই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা: এখন অনুসন্ধান পর্যায়েই সন্দেহভাজন যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে দুদক। আগে এ ক্ষমতা ছিল তদন্ত পর্যায়ে, অর্থাৎ মামলা হওয়ার পর। এ জন্য দুদক আইন, ২০০৪-এর দুটি ধারার সংশোধন করা হয়েছে। গত ২১ জুন সংশোধিত আইনের গেজেট প্রকাশ করা হয়। দুদক আইনে মামলার আগের প্রক্রিয়াকে বলা হয় অনুসন্ধান। আর মামলার পরের কার্যক্রমকে বলা হয় তদন্ত। নতুন এ আইনের ক্ষমতাবলে অনুসন্ধান ও তদন্ত দুই পর্যায়ে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) ক্ষমতা ভোগ করবেন।
এবার বীমা খাতে দুদক: আগে কখনো বীমা খাতে উল্লেখ করার মতো কোনো অনিয়ম নিয়ে দুদক কাজ করেনি। তবে গত ২১ জুন প্রথমবারের মতো ১৭ জীবন বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত এক হাজার ৮৬২ কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ ছাড়াও আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ একচুয়ারির বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। এতে করে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পর এবার বীমা খাতে নতুন করে শুরু হয়েছে দুদক আতঙ্ক। বিভিন্ন বীমা কোম্পানি সূত্র এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, দুদকের তদন্তের খবরে বীমা খাতে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ইতোমধ্যে দুদক বেশ কয়েকটি বীমা কোম্পানির এমডিদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, বাকিদের ডাকবে। এটা নিয়ে বীমা খাতে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং এটা স্বাভাবিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.