অক্টোবর ২৭, ২০২০

নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্ট নির্বাচনে শাসকদল জয়ী ইউরোপে স্বস্তি

১ min read

নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছে দেশটির শাসক দল ভিভিডি। পরাজয় ঘটেছে অভিবাসন, ইসলাম ও ইইউ-বিরোধী রাজনীতিক গার্ট উইল্ডার্সের ফ্রিডম পার্টির (পিভিভি)। যুক্তরাষ্ট্রে ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী জয় আর যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট নির্বাচনের মতো ডাচ্‌ নির্বাচনকে দেখা হচ্ছিল ইউরোপের পপুলিস্ট দলগুলোর ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে। ফলে শ্যেন দৃষ্টিতে নির্বাচনের দিকে খেয়াল রেখেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। বৃটেনের ব্রেক্সিটের পর ইউরোপের দেশে দেশে ইইউ-বিরোধী কণ্ঠ সরব হয়ে উঠেছিল। ফ্রান্সে ম্যারিন ল্য পেন আর
নেদারল্যান্ডসে গার্ট উইল্ডার্স ছিলেন এ কণ্ঠের ধারক। তাই উইল্ডার্সের পরাজয়ে দৃশ্যত স্বস্তির বাতাস ইউরোপন্থি নেতাদের মধ্যে। আর এ স্বস্তি লুকোচাপা দেয়ার কোনো চেষ্টাও করেননি তারা।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ ভোটগণনা সম্পন্ন হয়েছে। ২৮টি দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুত্তের মধ্যডানপন্থি দল ভিভিডি পেয়েছে ৩৩টি আসন। ১৫০ আসন-বিশিষ্ট ডাচ্‌ পার্লামেন্টে এককভাবে সর্বোচ্চ আসন দলটির। তবে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই ভিভিডির। আগেরবারের চেয়ে ৫টি আসন বেশি পেয়ে মাত্র ২০টি আসন পেয়েছে উইল্ডার্সের পিভিভি। আর ১টি আসন কম পেয়ে পিভিভির পরেই আছে ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেট (সিডিএ) ও বাম প্রগতিশীল দল ডি ৬৬।
নির্বাচনে জিতে নির্ভার প্রধানমন্ত্রী রুত্তে। বলেছেন, ‘নেদারল্যান্ডসের প্রতি আমাদের যে বার্তা তা ভোটারদের কাছে আমরা পৌঁছাতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, ‘এটি এমন এক সন্ধ্যা যখন নেদারল্যান্ডস ভুল পপুলিজমকে প্রত্যাখ্যান করেছে।’
গত দুই বছরের বেশিরভাগ সময়ই বিভিন্ন জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন উইল্ডার্স। এমনকি এক পর্যায়ে তার দল মোট ভোটের ২৫ শতাংশ পাবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছিল। কিন্তু ভোটের দিন ওই অনুমানের অর্ধেক ভোট পেয়েছে ফ্রিডম পার্টি। তবে এককভাবে শীর্ষ দল হতে না পারলেও নির্বাচনে ইতিবাচক কিছু খুঁজে পেয়েছেন তিনি। ভিভিডি’র ৮টি আসন হারানো আর তার দলের ৫টি আসন জয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা ওই দল নয় যারা হেরেছে। প্রকৃতপক্ষে, আমরা আসন বেশি পেয়েছি। এটি এমন ফলাফল যা নিয়ে গর্ববোধ করা যায়। আর রুত্তে নিশ্চিতভাবেই আমার কাছ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে না।’
অন্যদিক থেকে হিসাব করলে এ নির্বাচনে উইল্ডার্সের অর্জনও কম নয়। তার তীব্র ইসলাম ও অভিবাসী-বিরোধী বাগাড়ম্বর প্রধানমন্ত্রী রুত্তেওকেও ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য করেছে। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের শেষের দিকে রুত্তেও কিছুটা অভিবাসী-বিরোধী সুরে ছিলেন। আর্মস্টারডামের ফ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানী আন্দ্রে ক্রুয়েল বলেন, ‘উইল্ডার্স সরকার গঠন করতে চাননি। তিনি যা চেয়েছেন সেটি হলো বড় দুই দলকে তার ইচ্ছানুযায়ী যেতে বাধ্য করা। আর তার দল ওই লক্ষ্য
অর্জনে অনেকটাই সফল। তাই এই হিসেবে তিনি নির্বাচন জিতেই গেছেন।’
তবে পিভিভি নির্বাচনে প্রথম হলে নিশ্চিতভাবে ইউরোপজুড়ে আসন্ন অন্যান্য জাতীয় নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়তো। ফ্রান্সে উগ্র ডানপন্থি নেত্রী ম্যারিন ল্য পেন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দ্বিতীয় হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর জার্মানির ইউরো-বিরোধী দল এএফডি এ বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ভালো করবে বলে জনমত জরিপে উঠে এসেছে।
তাই ডাচ্‌ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নিজেদের স্বস্তির কথা জানিয়েছেন ইউরোপের অনেক রাজনীতিবিদ। ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদ জাঙ্কারের এক মুখপাত্র ফলাফলের প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, এটি হলো চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে জয়। জাঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রুত্তেকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠিও লিখেছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বলেছেন, নির্বাচনে বিপুল ভোটদানের হার প্রমাণ করে এটি ইউরোপের পক্ষে নেদারল্যান্ডসবাসীর রায়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়া ওঁলাদ টুইট করেছেন, মার্ক রুত্তেকে অভিনন্দন চরমপন্থার বিরুদ্ধে তার সপষ্ট বিজয়ের জন্য। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ মার্ক আয়রল্ট টুইট করেছেন, উগ্র ডানপন্থার অগ্রগতি থমকে দেয়ার জন্য নেদারল্যান্ডসকে অভিনন্দন। ইইউ পার্লামেন্টের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জার্মানির সোস্যাল ডেমোক্রেট পার্টির চ্যান্সেলর প্রার্থী মার্টিন সুল্টয বলেছেন, এ ফলাফলে তিনি নির্ভার। ইতালির প্রধানমন্ত্রী পাওলো জেন্তিলোনি বলেছেন, কোনো নেক্সিট নয়! ইইউ-বিরোধী ডানরা ডাচ্‌ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে।
তবে আসনের হিসাবে এ নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো করেছে ইউরোপন্থি বামপন্থি পরিবেশবাদী দল গ্রিনলেফট। দলটির আসন ছিল ৪টি, আর এখন হয়েছে ১৪টি! ধারণা করা হচ্ছে, জোট সরকারে থাকবে তারা। আবার রুত্তের গত সরকারের জোট শরিক লেবার পার্টি এবার বড় ধরনের পরাজয় বরণ করেছে। গত পার্লামেন্টে দলটির আসন সংখ্যা ছিল ৩৮টি, এবার হয়েছে ৯টি।
প্রধানমন্ত্রী রুত্তে এখন নতুন জোট সরকার গঠনের কাজ শুরু করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভিভিডি, সিডিএ ও ডি৬৬ গঠন করবে নতুন সরকার। কিন্তু এরপরও সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ৭৬টি আসন থেকে ৫টি আসন কম হবে। তাই চতুর্থ শরিকের পেছনে ছুটতে হবে তাকে।
নেদারল্যান্ডসের ‘অ-ইসলামীকরণ’ ও দেশটিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়া উইল্ডার্স এ সরকারে ঢুকবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। আর ভিভিডি সহ অন্যান্য দল আগে থেকেই বলে দিয়েছিল পিভিভির সঙ্গে তারা কোনো জোট করবে না। নির্বাচনে ভোটদান ছিল প্রচুর। মোট ৮০.২% ভোটার ভোট দিয়েছেন।
তবে অনেকেই বলছেন, এ নির্বাচনের ফলেই উগ্র ডানপন্থার অবসান হয়ে গেছে ভাবলে ভুল হবে। ডাচ্‌ রাজনৈতিক ভাষ্যকার রডেরিক ভিলো বলেন, রুত্তে টিকে গেছেন। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন, ব্যর্থ সমন্বয় প্রক্রিয়া ও ব্রাসেলসের ক্ষমতা নিয়ে সামাজিক বিতৃষ্ণাও রয়ে গেছে। তাই নতুন যে সরকার দেশ শাসন করবে, তারা যদি সাহস নিয়ে এই ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, তবেই পপুলিস্ট উত্থান স্তিমিত হবে দ্রুত। স্থানীয় এনআরসি পত্রিকা নিজেদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, কোনো পপুলিস্ট বিদ্রোহ জাগ্রত হয়নি। নেদারল্যান্ডসের জনগণ অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে ঘুম থেকে উঠেছে। এতে আরো বলা হয়েছে, বিদায়ী সরকার এ বছর স্বপ্নের এক বাজেট দিয়েছে। যা যা চাওয়া ছিল মানুষের, পূরণ হয়েছে। ইইউতে সবচেয়ে ভালো ফলাফলকারী দেশগুলোর একটি হলো নেদারল্যান্ডস। কিন্তু এরপরও বিদায়ী জোট নির্বাচনে ভালো শাস্তিই পেয়েছে। ভোটারদের কাছে দৃশ্যত রাজনীতি মানে অর্থনীতির চেয়েও বেশি কিছু।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.