সোম. সেপ্টে ২১, ২০২০

মার্জিন ঋণের ফাঁদে নিঃশ্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

১ min read

যে ফাঁদে নিঃশ্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

সাম্প্রতিককালে শেয়ারবাজারে বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে আত্মঘাতী মার্জিন ঋণ। যার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের উভয় বিনিয়োগকারী। এ ঋণ সামগ্রিকভাবে বাজারের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। আর এ ইস্যু নিয়ে বারবার সরকারকে জিম্মি করে নেতিবাচক অ্যাকাউন্টেও শেয়ার লেনদেন অব্যাহত রাখছে প্রভাবশালী একটি গ্রুপ। এ প্রক্রিয়ায় কৃত্রিমভাবে কিছুদিন বাজার চাঙ্গা রাখায় বিভ্রান্ত হয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আর মুনাফা লুটে নিচ্ছে হাতেগোনা কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। সুদের চক্রে বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হলেও ব্রোকারেজ হাউসগুলো লাভ করছে। নিয়মের মধ্যেই এমন কাণ্ড ঘটলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সব জেনেশুনে চোখ বন্ধ করে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মার্জিন ঋণ বাজারের জন্য যতটা উপকার, তার চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশি। আর বাংলাদেশের মতো দুর্বল বাজারের জন্য যা মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাজার অতিমূল্যায়িত হওয়ার ক্ষেত্রেও মার্জিন ঋণ দায়ী। তাদের মতে, মৌলভিত্তির বাইরে দুর্বল কোম্পানি নিয়ে কারসাজিতেও এ ঋণ সহায়ক।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ড. এমএ বাকী খলীলী বলেন, বাজার অতিমূল্যায়িত হওয়ার ক্ষেত্রে মার্জিন ঋণ সহায়ক শক্তির কাজ করে তাতে সন্দেহ নেই। ২০১০ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অতিমূল্যায়িত হওয়ার পেছনে মার্জিন ঋণের বিশাল ভূমিকা ছিল। সব সময়ই এ ঋণ বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে। তাই সরকারের উচিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিবর্তে মার্জিন ঋণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে ছেড়ে দেয়া। কারণ এ ঋণের কারণে সার্বিক ঋণ সরবরাহে পরিবর্তন আসে।

 

শেয়ার কিনতে মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ব্রোকারেজ হাউস থেকে গ্রাহককে যে ঋণ দেয়া হয়, তাই মার্জিন ঋণ। গ্রাহককে দেয়া ঋণের এ অর্থ আবার সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস অন্য কোনো উৎস থেকে ঋণ হিসেবে নেয়। ফলে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের এ ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ কারণে দাম কমে গেলে গ্রাহকের শেয়ার ফোর্ডস সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রি) করে পুষিয়ে নেয় তারা। এতে গ্রাহক পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান। বর্তমানে মার্জিন ঋণের এ হার ১ : ০.৫। এর অর্থ হচ্ছে কোনো গ্রাহকের ১০০ টাকা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস থেকে ৫০ টাকা ঋণ নেয়া যাবে। যদিও বর্তমানে এ মাত্রা তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহনীয়। কিন্তু ২০১০ সালে গ্রাহকের বিনিয়োগের বিপরীতে দশ গুণ পর্যন্ত ঋণ দিয়েছিল বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস। ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা পুরো দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আর এ অবস্থা কাটিয়ে শেয়ারবাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।

 

বিএসইসি সূত্র জানায়, শেয়ারবাজারে লেনদেন করছে, বর্তমানে এমন ব্রোকারেজ হাউসের সংখ্যা ২৩৯টি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহক ৫৭ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা বাজারে বিনিয়োগ করেছেন। আবার এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রাহককে মার্জিন ঋণ দিয়েছে এমন হাউসের সংখ্যা ৯৮টি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসব হাউসের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে ঋণের হার গ্রাহকের বিনিয়োগের ১৪ শতাংশ। তবে শীর্ষ দশটি হাউসের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ২০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের ৬৭ শতাংশ মাত্র ১০টি হাউস বিতরণ করেছে।

 

মার্জিন ঋণের ভয়াবহতা নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজার উত্থান-পতনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হল মার্জিন ঋণ। ২০০৪ সালে মার্জিন ঋণ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব মুয়েনস্টার। ওই প্রতিবেদনে মার্জিন ঋণকে বাজারের জন্য অভিশাপ হিসেবে দেখানো হয়। এতে বলা হয়, আর্থিকভাবে শক্তিশালী বিনিয়োগকারীরা মার্চেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে আঁতাত করে বেশি পরিমাণে ঋণ নেয়। এর ফলে তারা ইচ্ছামতো দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে। আর বাজার ধীরে ধীরে অতিমূল্যায়িত হয়। এরপর বাজারে মূল্য সংশোধন হলে তুলনামূলকভাবে কম পুঁজির সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

 

বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পুঁজিবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে ২০১১ সালে গঠিত স্কিম কমিটির হিসাবে দেখা গেছে, দেশের শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণ নিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এমন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৬ লাখ ৬৯ হাজার। তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার ৭০ কোটি টাকা।

 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, যেসব বিনিয়োগকারী ঋণ নিয়েছেন, তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আর ঋণের বাইরে থাকা বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি সম্পূর্ণভাবে হারাননি। ফলে ঋণের ব্যাপারে সব সময় সতর্ক থাকা উচিত। তিনি বলেন, বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। কারণ কৃত্রিমভাবে বাজার বাড়ানো হলে তা টেকসই হয় না।

 

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ঋণাত্মক বিও হিসাব সক্রিয় রাখতে মার্জিন ঋণের বিদ্যমান আইন স্থগিতের মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে কোনো বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও যত নেতিবাচকই হোক, তিনি শেয়ার লেনদেন করতে পারবেন। বিএসইসির কাছে এ ব্যাপারে সুপারিশ পাঠায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। মার্জিন রুলসের এ ধারায় উল্লেখ আছে- ঋণাত্মক মূলধনধারী অ্যাকাউন্টে গ্রাহক নিজে শেয়ার লেনদেন করতে পারবেন না। শুধু ঋণদাতা ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক এ ধরনের অ্যাকাউন্টে শেয়ার বিক্রি করে তার ঋণ সমন্বয় করতে পারবে। ২০১০ সালের ধসের পর বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএসইসি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাটির কার্যকারিতা স্থগিত করে। এরপর কয়েক দফায় স্থগিত আদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। স্থগিতাদেশের সর্বশেষ মেয়াদ গত ৩১ জানুয়ারি শেষ হয়েছে। এরপর তা আরও ৬ মাস বাড়ানো হয়।

 

‘১৯৯৯ সালের মার্জিন রুলসের ৩(৫) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে- কোনো বিনিয়োগকারীর ডেবিট ব্যালেন্স ১৫০ শতাংশের নিচে নামলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তার কাছে নতুন করে মার্জিন চাইবে। এ মার্জিনের পরিমাণ এমন হবে যাতে তার ডেবিট ব্যালেন্স ১৫০ শতাংশের ওপরে থাকে। নোটিশ দেয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে পর্যাপ্ত মার্জিন জমা দেয়া না হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে নতুন কোনো লেনদেনের অনুমতি দিতে পারবে না ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.