সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

নতুন কৌশলে হঠাৎ সক্রিয় জঙ্গিরা

১ min read

নতুন কৌশলে আবারও সক্রিয় হচ্ছে উগ্রপন্থি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরপর বেশ কয়েকটি ঘটনা থেকে তার ইঙ্গিত মিলছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সম্প্রতি গ্রেফতার একাধিক জঙ্গি জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছে, নতুনভাবে দল গোছানোর চেষ্টা করছে তারা। সর্বশেষ সীতাকুণ্ডের জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধার করা সরঞ্জাম, বিভিন্ন আলামত ও হামলার ধরন থেকে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন কৌশল নিয়ে এবার মাঠে নেমেছে জঙ্গিরা। আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও বড় ধরনের বোমা পাওয়া গেছে এ আস্তানায়। জঙ্গি আস্তানা থেকে এর আগে বিভিন্ন সময় যে ধরনের বোমা পাওয়া গেছে, সেগুলোর তুলনায় বর্তমানে পাওয়া বোমার আকার ৫-৬ গুণ বড়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত না রাখলে জঙ্গি তৎপরতা আরও বেড়ে যেতে পারে।

 গত বছর হলি আর্টিসান ও শোলাকিয়ায় হামলার পর বেশ কয়েক মাস জঙ্গিদের দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল না। গতকাল উত্তরায় র‌্যাব ক্যাম্পে আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার অপচেষ্টা, টঙ্গীতে হরকাতুল জিহাদ অব বাংলাদেশের (হুজিবি) শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা, কুমিল্লায় শক্তিশালী বোমাসহ নব্য জেএমবির দুই সদস্য গ্রেফতার ও সীতাকুণ্ডে দুটি আস্তানায় অভিযান চালানোর পর আত্মঘাতী নারী জঙ্গিসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে জঙ্গিরা আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে।

এ ব্যাপারে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের ডিসি মুহিবুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, ‘জঙ্গিরা আবারও হয়তো কোনো না কোনোভাবে সংঘবদ্ধ হয়েছে। অনেক দিন ধরে যারা পলাতক ছিল, তারাও নতুনভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা
করছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অতীতে জঙ্গিদের কার্যক্রম রুখে দেওয়া হয়েছে। এবারও তার ব্যত্যয় হবে না।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ সমকালকে বলেন, সম্প্রতি কিছু ঘটনায় মনে হচ্ছে, জঙ্গিরা পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের ঘাঁটিগুলো ঢাকার বাইরে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে হামলা করার চেষ্টা চলছে। হামলার নতুন ধরন থেকে মনে হচ্ছে তাদের কেউ নির্দেশ দিয়েছে, আত্মহননই জিহাদের সঠিক পথ। এই ভুল নির্দেশনায় চালিত হচ্ছে তারা। সামগ্রিক বিবেচনায় জঙ্গিরা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। তাদের সংগঠনের নেতাকর্মীরা মনস্তাত্তি্বকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। হয়তো তাই তাদের ভাষায় কিছু ‘সার্থক হামলা’ চালিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ছয়টি স্থানে নতুনভাবে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা :জঙ্গিদের তৎপরতার ওপর গোয়েন্দা তথ্য রাখেন এমন একাধিক কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে জানান, সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার একাধিক জঙ্গি জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানায়, নতুনভাবে দল গুছিয়ে মাঠে নামছে তারা। চট্টগ্রামকে ঘিরে ‘সেফ হোম’ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে সেখানে একাধিক আস্তানা গড়ে তোলা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ঢাকায় বাসা ভাড়া নেওয়া ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য’ হওয়ায় জঙ্গিরা চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত ছয়টি জায়গায় নতুনভাবে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। সিলেটের সীমান্ত এলাকা, যশোর ও ঝিনাইদহে তারা গোপন আস্তানা বানাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ২০১৩ সালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর মাধ্যমে যেভাবে নব্য জেএমবি নতুন করে তৎপর হয়েছিল, একইভাবে নতুন এক ব্যক্তিকে সামনে রেখে তারা আবারও তৎপর হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই ব্যক্তি সম্পর্কেও কয়েকটি তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের শেষ দিকে উত্তরার সূর্য ভিলায় যে ধরনের বোমা পাওয়া গেছে, সে তুলনায় সীতাকুণ্ড ও র‌্যাবের ক্যাম্পে বিস্ফোরিত বোমার ধ্বংসক্ষমতা কয়েক গুণ বেশি। গোয়েন্দাদের ধারণা, কোনো না কোনোভাবে জঙ্গিদের হাতে অনেক অর্থ যাচ্ছে, যা দিয়ে তারা বোমা তৈরির সরঞ্জাম কিনছে। বোমা মিজান, সাগর, সোহেল মাহফুজ নব্য জেএমবির জন্য বোমা তৈরি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি মুসাকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। দীর্ঘ দিন ধরে মুসাসহ অন্যরা পলাতক।

কয়েকটি দল একত্রিত হচ্ছে :জঙ্গিদের কয়েকটি দল একত্রিত হয়ে নতুন হামলার ছক কষছে। হুজি নেতা মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আনসার আল ইসলাম ও হুজিবি যৌথভাবে হামলা করেছে বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। সংগঠনের নেতারা জঙ্গিদের নির্দেশনা দিয়েছে_ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কোনোভাবেই জীবিত ধরা পড়া যাবে না। কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার জঙ্গি আজওয়াদ পুলিশকে জানায়, গ্রেফতার হওয়ার আগেই সে দুই দফায় ১২টি বোমা ঢাকায় পেঁৗছে দিয়েছিল। ওই বোমা কার হেফাজতে রয়েছে তা জানার চেষ্টা চলছে। নব্য জেএমবির ট্রেনিং নিয়েছে_ এ ধরনের পাঁচটি গ্রুপ রয়েছে, যেখানে অন্তত ২৫ সদস্য আছে। আরও ৫০ জনকে নব্য সদস্য করতে ‘মগজ ধোলাই’ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে যে সব উগ্রপন্থি বিদেশে পালিয়েছে, তাদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে তারা নতুনভাবে জঙ্গিদের রিক্রুট করছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনেকের ধারণা, পলাতক জঙ্গিদের মাধ্যমে দেশীয় উগ্রপন্থিদের কাছে অর্থ আসছে। অন্তত ১৮ জনের খোঁজ রয়েছে, যারা উগ্রপন্থায় জড়িয়ে এখন দেশের বাইরে। এ ছাড়া তিন বাংলাদেশি নাগরিক এরই মধ্যে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে মারা গেছে। পলাতকরা যাতে দেশে ফিরতে না পারে সে ব্যাপারে সব বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে ছবিসহ তথ্য দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.