নভেম্বর ২৬, ২০২০

নূর হোসেন ছিল পাঁঠার বলি : এরশাদ

১ min read

পানি-টলমল চোখে আবেগঘন বক্তৃতায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, আমার হাতে রক্তের কোনো দাগ নেই। নূর হোসেন ছিল বলির পাঁঠা। জেল থেকে বেরিয়ে তার পিতাকে ঢাকার গিয়ে প্রতি মাসে ৫ হাজার করে টাকা দিতাম। আমার হাতে রক্ত থাকলে সেটা কখনই করতে পারতাম না। এরশাদ বলেন, উত্তরবাঙ্গ যার, ঢাকার মসনদ তার। আগামী নির্বাচনে বৃহত্তর রংপুরের ২২টিসহ ৩২টি আসনে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গিয়ে পুত্রহারা মা, স্বামীহারা স্ত্রীর চোখের পানি মুছে দিতে চাই। এসময় তিনি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন।

শনিবার বিকেলে রংপুর ঐতিহাসিক পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসিরের উপস্থাপনায় সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, সাবেক এমপি হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, মেজর(অব) খালিদ আখতার, আন্তর্জাতিক সম্পাদক সেলিম উদ্দিন, বিরোধী দলীয় হুইপ শওকত হোসেন চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান, শাহানারা বেগম এমপি, এসএম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, রংপুর জেলা সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, দিনাজপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি, গাইবান্ধা জেলা সভাপতি আব্দুর রশিদ চৌধুরী, বগুড়া জেলা সভাপতি মোস্তাক কামাল, নীলফামারী জেলা সভাপতি সাজ্জাদ পারভেজ, রংপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি আসিফ শাহরিয়ার, দিনাজপুর জেলা সেক্রেটারী আহমেদ শরীফ রুবেল, জাতীয় যুব সংহতির কেন্দ্রীয় আহবায়ক আলমগীর কবির লোটন, জাতীয় মোটর শ্রমিক পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি মোস্তাক আহম্মেদ প্রমুখ।

এরশাদ বলেন, আমি সারা দেশের ৩৫ টি জেলায় সম্মেলন করেছি। রংপুরের হচ্ছিল না। আজ সে আশা পূর্ণ হলো। এসময় তিনি রংপুর জেলা সম্মেলনের তারিখ ঘোষণারও নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ভারতে একটা কথা আছে উত্তর প্রদেশ যার, দিল্লির মসনদ তার। আর আমি বলি উত্তরবঙ্গ যার, ঢাকার মসনদ তার। তাই বৃহত্তর রংপুরের ২১টিসহ ৩২টি আসন পাওয়ার মাধ্যমে আমরা ক্ষমতায় যাবো। আমাদের সেটা পারতে হবে।

তিনি বলেন, এখন টিভির পর্দায় দেখা যায় শুধু দেশে এখন স্বামীহারা স্ত্রীদের কান্নার রোল। সন্তানহারা মায়েদের কান্নার রোল। তাদের এই কান্না আমাদের কারো হৃদয়ে দাগ কাটে। ক্ষমতাসীনদের মনে দাগ কাটে না। মায়েদের, স্ত্রীদের ভাইদের বাপেদের চোখের পানি মুছে দিতে হবে । যাতনা লাঘব করতে হবে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি বলেন, সারাদেশের মানুষের এখন ভরসা জাতীয় পার্টি। ৯০ সালে যখন ক্ষমতা ছেড়েছিলাম। তখন অঙ্গিকার ছিল। আমাকে নির্বাচন করতে দেয়া হবে। কিন্তু তা করা হয় নি। আমাকে, আমার স্ত্রীকে আমার ৫ বছরের ছেলে ও মেয়েকে জেলে নেয়া হয়েছে। আড়াই বছর জেলে রাখায় আমার সন্তানদের পড়ালেখা হলো না। আমার স্ত্রী রাজনীতি করতো না। তবুও তাকে জেলে নেয়া হয়েছে। ৬ বছর আমাকে জেলে রাখা হয়েছে। আমি কারো সাথে কথাটুকুও বলতে পারতাম না।

একপর্যায়ে চোখে টলমল পানি এনে এরশাদ বলতে থাকেন, আমার সাথে কথা বলার অপরাধে একজন দারোগার ওপর অমানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। যে মানুষের সাথে প্রতিদিন হাজার মানুষের সম্পর্ক। জনতার সম্পর্ক। সেই মানুষ আমাকে জেলের অন্ধকারে বোবা মানুষ বানিয়ে রাখা হয়েছিল। আমার ডায়াবেটিস ছিল ২৯ দশমিক ২। আমাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হয়নি। আমাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারা চেয়েছিল যে আমি অকালে দুনিয়া থেকে বিদাই হয়। কিন্তু তাদের চেষ্টা সফল হয় নি। আল্লাহ আছেন। সেটা প্রমাণিত হয়ে গেছে। আমি বেঁচে আছি।

এরশাদ বলেন, বিএনপি চেয়েছিল আমাকে ফাঁসি দিবে। কিন্তু তারা পারেনি। রংপুরের মানুষ আমাকে জেলে রেখে ৫ টি আসনে এবং পরে আবারো ৫টি আসনে নির্বাচিত করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা বিরল জেলে থাকা মানুষ ৫টি আসনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়।

এরশাদ বলেন, তবুও আমি সমর্থন দেয়নি। এরপর আমার পার্টিকে ভাগ করা হলো আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে দিয়ে। আমার পার্টির এমপিতে ১৫/১৬ কোটি করে টাকা দিয়ে কিনে নেয়া হলো। কোথাও কারো কাছে সুবিচার পেলাম না। অন্ধকারেই থাকলাম। আমাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হলো।

তিনি বলেন, আমার হাতে রক্তের কোনো দাগ নেই। নুর হোসেনের বুকে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে তাকে হত্যা করেছিল তারা। নুর হোসেন ছিল তাদের পাঠার বলি। আমি জেল থেকে বের হওয়ার পর নূর হোসেনের বাসায় যাই। তার বৃদ্ধ পিতাকে প্রতি মাসে ৫ হাজার করে টাকা দিতাম। অন্যরা তার পরিবারের খোঁজ রাখেনি। কারণ তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছিল। আমার হাতে রক্তের দাগ থাকলে আমি নুর হোসেনের পিতার কাছে যেতাম না। তার পিতা আমার কাছ থেকে টাকা নিতো না।

এরশাদ বলেন, আমার হাত রক্ত রঞ্জিত নয়, এ জন্য আমার কোনো গানম্যান লাগে না, সিকিউরিটি লাগে না। আমি সারা দেশ চষে বেড়াই। আমার কোনো নিরাপত্তার প্রয়োজন হয় না। তিনি বলেন, আমাদেরকে তোমরা আবার সুযোগ দিবে। আমি ক্ষমতায় গিয়ে সন্তানহারা মায়ের চোখের স্বামীহারা স্ত্রীর চোখের পানি মুছে দিতে চাই।

১৪ মিনিটের আবেগঘন বক্তব্যের একপর্যায়ে এরশাদ আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন। এসময় তুমুল করতালিতে পুরো প্রাঙ্গন মুখিরত থাকে প্রায় ৫ মিনিট। পরে তিনি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে রংপুর মহানগর সভাপতি এবং এসএম ইয়াসিরকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেন।
সম্মেলনের শুরুর দিকে এরশাদের পুত্র এরিখ এরশাদ জাতীয় পার্টির সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এর আগে এরশাদ জাতীয় ও দলীয় পতাকা এবং শান্তির পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.