জুন ১৮, ২০২১

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে

১ min read

নতুন আলো নিউজ ডেস্ক: কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে চলছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ। নানা কারণে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী জনতোষণবাদ (পপুলিজম) উত্থানের ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে। একে ইউরোপের ভবিষ্যৎ বেছে নেয়ার ভোট হিসেবেও আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বার্তাসংস্থা এপি’র খবরে বলা হয়, নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে ৬৬ হাজার কেন্দ্রে ৫০ হাজারেরও বেশি পুলিশ ও রক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। ফ্রান্সের ইতিহাসে এবারই প্রথম জরুরি
অবস্থার মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে। ২০১৫ সালের নভেম্বরে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে।
মোট ১১ জন প্রার্থী লড়ছেন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চয়তাময় এই নির্বাচনে। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, চার শীর্ষ প্রার্থীর সমর্থন প্রায় কাছাকাছি। ফলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট কেউই পাচ্ছে না বলা চলে। সেক্ষেত্রে ভোট গড়াবে দ্বিতীয় দফায়। ৭ই মে’র ওই দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে শুধুমাত্র লড়বেন প্রথম দফায় সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া শীর্ষ দুই প্রার্থী।
টেলিগ্রাফের খবরে বলা হয়, নির্বাচনে ভোটার অংশগ্রহণ প্রত্যাশার চেয়েও বেশি, যদিও নির্বাচন-পূর্ব জরিপে উঠে এসেছিল যে, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ভোটার ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। দিনের মধ্যভাগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ২৮.৫৪ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়ে ফেলেছেন। এই হার ২০১২ সালের কাছাকাছি। এপি’র খবরে বলা হয়, কানাডার মন্ট্রিলে ফরাসি নাগরিকদের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন, ভোটার উপস্থিতি কম থাকলে সুবিধা হতো আলোচিত প্রার্থী ম্যারিন ল্য পেনের। তবে মানুষকে ভোট দিতে বেরিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন দেশের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি। অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল ফ্রন্ট জয়ী হলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) ধসে পড়বে।
জনমত জরিপে শীর্ষ দুই প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন এই দলের প্রার্থী ম্যারিন ল্য পেন এবং মধ্যপন্থি স্বতন্ত্র প্রার্থী ও দেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইমানুয়েল ম্যাক্রন। তবে রক্ষণশীল দলের প্রার্থী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া ফিলন এবং অকস্মাৎ পাদপ্রদীপের আলোয় আসা কট্টর বামপন্থি জ্যঁ মেলেঞ্চনও বেশি দূরে নেই।
ফ্রান্সের প্রায় ১০ শতাংশ বেকারত্বের হার, যুজতে থাকা অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ৪ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের সামনে প্রধান ইস্যু। এই নির্বাচনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভবিষ্যতের ওপর ভোট হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বেশিরভাগ প্রার্থীই এই জোটের বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। উগ্র ডানপন্থি ল্য পেন ও কট্টর বামপন্থি মেলেঞ্চনের রাজনৈতিক অবস্থান একেবারে বিপরীত মেরুতে হলেও, উভয়েই বলছেন ২৮ জাতির এই জোট থেকে ফ্রান্স বেরিয়ে যেতে পারে। জয়ী হলে বাদ দেবেন যৌথ মুদ্রা ইউরো। বৃটেনের পর ইইউ থেকে ফ্রান্সের প্রস্থান প্রায় নিশ্চিতভাবেই ইইউ’র ধস নামাতে পারে।
এপি’র খবরে বলা হয়, ল্য পেন ও মেলেঞ্চনের মধ্যে একজনও যদি দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে যেতে পর্যাপ্ত ভোট পান, তাহলেই একে দেখা হবে উদীয়মান জনতোষণবাদের বিজয় হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রে ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয় ও বৃটেনে ইইউ থেকে প্রস্থানের পক্ষে ভোটকে এই জোয়ারের প্রতিফলন হিসেবে ভাবা হয়।
তবে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অতটা হাড্ডাহাড্ডি হবে না বলেই জরিপে উঠে এসেছে। অন্তত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও বৃটেনের ব্রেক্সিট নির্বাচনের মতো অবস্থায় যাবে না। কারণ, প্রথম দফায় ল্য পেনের সমর্থন বাকি তিন প্রার্থীর তুলনায় কাছাকাছি থাকলেও, দ্বিতীয় দফায় তিনি একক প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হবেন বলে জরিপে দেখা যাচ্ছে। অপর দুই শীর্ষ প্রার্থী ম্যাক্রন ও ফিলন ইউরোপিয়ান ঐক্যের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তারা দেশের শ্রম নীতি সংস্কারের ঘোষণাও দিয়েছেন।
এদিকে ল্য পেন ভোট দিতে যাওয়ার সময় প্রতিবাদ জানিয়েছেন কয়েকজন ‘টপলেস’ বিক্ষোভকারী। এ সময় নারীবাদী ৬ কর্মীকে আটকও করেছে পুলিশ। তারা ল্য পেন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মুখোশ পরে প্রতিবাদ প্রদর্শন করেন। তবে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী খুব দ্রুতই তাদেরকে ভ্যানে উঠিয়ে নেয়। এর কিছুক্ষণ পর ওই ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোটপ্রদান করেন ল্য পেন।
ম্যাক্রন উত্তর ফ্রান্সের উপকূলীয় শহর ল্য তোকেতে ভোট দিয়েছেন। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ব্রিজিটি ম্যাক্রন। সাবেক সমাজতন্ত্রী অর্থমন্ত্রী বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। ভোটারদের সঙ্গে তাকে সেলফি তুলতেও দেখা গেছে। সমাজতন্ত্রী প্রার্থী বেনয়েট হ্যামন ও কড়া বামপন্থি প্রার্থী ফিলিপ পোটোও ভোট দিয়েছেন।
এর আগে নিজের নির্বাচনী আসন দক্ষিণাঞ্চলীয় ফ্রান্সের কোরেজে ভোট দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ। তিনি নাগরিকদেরও ভোটদানের আহ্বান জানান। গত বছর অলিখিত প্রথার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্বাচনে পুনরায় লড়তে অস্বীকৃতি জানান প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ। বর্তমানে তার সমাজতন্ত্রী দলের প্রার্থী বেনয়েট হ্যামন। কিন্তু হ্যামনের নাম শীর্ষ ৪ ফ্রন্টরানারের মধ্যে নেই। অপরদিকে ওঁলাদেকে বলা হচ্ছে তার দেশের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অ-জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট।
এর আগে রক্ষণশীল দলের প্রার্থী ফ্রাঁসোয়া ফিলনের বৃটিশ স্ত্রী পেনেলোপি ফিলন তাদের গ্রামের এলাকায় ভোট দিয়েছেন। তবে তার সঙ্গে ফিলন ছিলেন না। কারণ, তিনি ভোট দিয়েছেন নিজের নির্বাচনী এলাকা প্যারিসে, যা বহু মাইল দূরে অবস্থিত। ফিলন একটি আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত। এর সঙ্গে নাম এসেছে তার স্ত্রীরও। অভিযোগ রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে স্ত্রী ও সন্তানকে ভুয়া চাকরি দিয়ে রাষ্ট্রীয় তহবিল ছয়নয় করেছেন ফিলন।
এদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যেও নিরাপত্তা বড় প্রভাবক হিসেবে ভোটারদের মনে কাজ করতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনের দুই দিন আগে প্যারিসের স্যঁজে এলিজিতে এক সন্ত্রাসী হামলায় এক পুলিশ সদস্য আহত ও দুই জন নিহত হন। এর আগে একাধিকবার ফ্রান্সে বড় আকারে সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হয়েছে। তাই নিরাপত্তা অনেক ভোটারের কাছেই মুখ্য হতে পারে। সেক্ষেত্রে ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র ঘোষণা দেয়া ল্য পেন সুবিধা পেয়ে যেতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Copyright © notunalonews24.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.